চসিকের ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা

নিউজগর্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।

আজ ৩০ জুন (মঙ্গলবার) বেলা পৌনে ১টায় নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাজেট ঘোষণা করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

পাশাপাশি বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার চারশ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়। গত বছর ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল।

নিজের মেয়াদে দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণা করে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নগরবাসীর আশার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশায় ও চট্টগ্রাম মহানগরকে ক্লিন-গ্রিন, হেলদি ও সেইফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক পর্যটন নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে বাজেট ঘোষণা করছি।”

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটেও অন্যান্যবারের মত সর্বোচ্চ ৯৭৫ কোটি টাকা উন্নয়ন অনুদান খাতে আয় ধরা হয়েছে। এছাড়া হার কর ও অভিকর খাতে ৪২৬ কোটি টাকা এবং বকেয়া কর খাতে ১৯৭ কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে।

পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে উন্নয়ন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে বেতন ভাতা ও পারিশ্রমিক খাতে।

বাজেট ঘোষণা করে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই আমার লক্ষ্য। অতীতে অযৌক্তিকভাবে যেসব গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলো যৌক্তিক করতে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। যাচাই বাছাইশেষে সঠিক ও ন্যায্যভাবে কর নির্ধারণ করা হচ্ছে।

“তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বন্দর, রেলওয়ে, ৩৬টি কনটেইনার টার্মিনাল ও অয়েল কোং লিমিটেডসহ বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সংস্থাগুলোকে অবশ্যই তাদের নিকট প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। কারণ রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।”

মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, আজ আমার ২য় বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনের শুরুতে আমি সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া আদায় করছি। বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ১৯৭১ সালের ২৬-এ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যাঁর স্মৃতিস্নিগ্ধ এ চট্টগ্রাম। শ্রদ্ধার সাথে আরো স্মরণ করছি বাহান্নের ভাষা শহিদ, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহিদ, ২ লক্ষ বীরাঙ্গনা মা-বোন, সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই ২৪-এ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সকল বীর শহিদদের। স্মরণ করছি চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রয়াত কীর্তিমান ব্যক্তিদের, যাঁদের মেধা ও শ্রম ব্যয় হয়েছে এই নগর বিনির্মাণে। আমি সশ্রদ্ধচিত্তে কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করছি বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান-এর প্রতি, যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুদক্ষ পরিচালনায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

নগরবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশায় ও চট্টগ্রাম মহানগরকে ক্লিন-গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক পর্যটন নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে বাজেট অধিবেশনে উপস্থিত সকলকে পুনঃ শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের ১ হাজার ৬ শত ৬৫ কোটি ৯২ লক্ষ ১৬ হাজার ৪০০ শত টাকার সংশোধিত বাজেট ও ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের ২ হাজার ২ শত ৬০ কোটি ২৪ লক্ষ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নগরবাসীর নিকট উপস্থাপন করছি।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান অনুমোদিত মোট জনবলের সংখ্যা ৪২২৬ জন। উক্ত জনবল দ্বারা সত্তর লক্ষ নগরবাসীকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করা সম্ভবপর নয় বিধায় যথাযথ নাগরিক-সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে জরুরি কার্য সম্পাদনের জন্য অস্থায়ীভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করে কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অত্র কর্পোরেশন দীর্ঘদিন যাবৎ অস্থায়ীভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মপরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান এবং ভবিষ্যতের চাহিদার বিষয়ে বিবেচনাপূর্বক যুগোপযোগী করে নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো ও নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে শুধুমাত্র আবেদন ফি দিয়ে ১২০ জন মেধাবী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের স্বচ্ছ নিয়োগ কার্যক্রম চলমান থাকবে। নগরীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে ওএমএস প্রক্রিয়ায় টিসিবি, ফ্যামিলি কার্ড এবং ত্রাণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাস্তা-নালা-ফুটপাথ দখলকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত আছে। ফলস্বরূপ নগরীর দীর্ঘদিনের ফুটপাথ দখলকারীদের উচ্ছেদের মাধ্যমে নগরবাসীকে চলাফেরার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে, পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, ডেঙ্গু ও মশক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তাই আসুন, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতার মেলবন্ধনে আমাদের এই চট্টগ্রামকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন, স্বাস্থ্যকর এবং আদর্শ বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলি।

চট্টগ্রাম একটি ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। এখানে দূষণ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। সেই দূষণ রোধে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গাছ। গাছ আমাদের পরম বন্ধু। এক সময় বাংলাদেশ ছিল বনভূমি ও সবুজ গাছে ভরপুর। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত দখল, পাহাড় উজাড় ও বন ধ্বংসের কারণে সবুজ আচ্ছাদন কমে গেছে। তাই সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে অংশ নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চট্টগ্রাম শহরকে সবুজ-শ্যামল ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। তৎপ্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত সড়ক ও অন্যান্য স্থানসহ বিভিন্ন স্থানে বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের সমন্বয়ে ৫ লক্ষ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে ১০ লক্ষ গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যক্তি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এ-কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান বিশ্বায়নে বড়ো চ্যালেঞ্জ পরিবেশ দূষণ। দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের ঋতুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিলম্বিত হচ্ছে বর্ষা। কয়েকটি ঋতুর ছোঁয়া অনুভবও করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম শহরকে নিরাপদ শহর, ক্লিন-গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটিতে পরিণত করার জন্য পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। এজন্য কর্ণফুলিকে দূষণমুক্ত করতে হবে, পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘ দিনের হকার্স সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফুটপাথ দখল করে হকার ব্যবসা পরিচালনার ফলে নগরে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এই সমস্যা নিরসনে পরিকল্পিতভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট স্থাপন করা হবে। হকার সমস্যা সমাধানে নগরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি পয়েন্টে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়ে চায়নার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ইপিজেড, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট ও স্টেশন রোড এলাকায় এই ধরণের মার্কেট নির্মাণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পাশে খালি জায়গায় হকারদের জন্য ভূমি বরাদ্দের চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রাম মহানগরের নাগরিক সমস্যার কথা সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ (Amader Chattogram) নামে একটা কার্যকরী অ্যাপ্স চালু করা হয়েছে। এটি নগরবাসীর জন্য চালু করা একটি ওয়ান-স্টপ সিটিজেন সার্ভিস অ্যাপ্লিকেশন। এই অ্যাপের মাধ্যমে আপনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সচিত্র অবহিত করতে পারবেন।

নগরীর কাজির দেউড়িতে অবস্থিত শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর স্মৃতিবিজড়িত শহিদ জিয়া জাদুঘরকে সংস্কার করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য যে মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রামের যে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড অর্গানাইজেশনগুলো আছে সবাইকে জাদুঘরটি সংরক্ষণে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা যিনি এই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দিয়েছিলেন এবং ‘উই রিভোল্ট’ বলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন সেই শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০-এ মে চট্টগ্রামের এই সার্কিট হাউসে শহিদ হয়েছিলেন। কাজেই উনার এই স্মৃতিবিজড়িত সার্কিট হাউস সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের সবার। এজন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রামের অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলোকে আমি বলতে চাই যে, আপনারা সবাই এটার জন্য একসাথে কাজ করবেন এবং আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসাবে এটার সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। আশা করি, অনতিবিলম্বে এটার কাজ শুরু হবে এবং শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই স্মৃতি-জাদুঘরের মাধ্যমে আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের ইতিহাস জানতে পারবে।

২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা
চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা। দক্ষ জনবল গড়ার লক্ষ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ। বর্তমান কাজের পরিধি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন এবং অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমসমূহ ডিজিটালাইজেশন করার লক্ষ্যে ERP Software তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ।

নগরবাসীর একমাত্র সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। একটি ক্লিন, গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সামর্থ্যের মধ্যে সেই-প্রত্যাশাপূরণে চসিক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সদিচ্ছা থাকলেও আর্থিক সক্ষমতা অপ্রতুল। আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া নগরবাসীর শত ভাগ প্রত্যাশাপূরণ কষ্টসাধ্য। শুধুমাত্র পৌরকরের ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। তাই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হলে সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিএফআইডিসি রোডে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মালিকানাধীন ৮ একর জায়গা এওয়াজ বদলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীতে সেনাবাহিনী কর্তৃক আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, উক্ত হাসপাতাল তৈরি হলে তা চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এতে ব্যাপক জনকল্যাণমুখী, কর্মবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কর্পোরেশন স্বনির্ভর হবে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই আমার লক্ষ্য। অতীতে অযৌক্তিকভাবে যেসব গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলো যৌক্তিক করতে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। যাচাই বাছাইশেষে সঠিক ও ন্যায্যভাবে কর নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বন্দর, রেলওয়ে, ৩৬টি কন্টেইনার টার্মিনাল ও অয়েল কোং লি.-সহ বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে অবশ্যই তাদের নিকট প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। কারণ রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

নগরীর সড়ক অবকাঠামোর নকশাগত ধারণক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ১০ টন, সেখানে বন্দরের ভারী যানবাহন নিয়মিতভাবে ২০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন বহন করে চলাচল করছে। প্রায় প্রতিটি লরি অনুমোদিত সীমার তিন গুণেরও বেশি ওজন নিয়ে সড়ক ব্যবহার করছে, যা সড়কের স্বাভাবিক স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটি সড়কের গড় আয়ুষ্কাল যেখানে স্বাভাবিকভাবে তিন থেকে পাঁচ বছর থাকার কথা, সেখানে অতিরিক্ত ওজন বহনকারী এসব যানবাহনের কারণে সড়ক দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এর ফলে প্রতিবছর শুধুমাত্র সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

এতদিন হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হচ্ছে। এই ডিজিটালাইজেশনের ফলে কর নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপির সুযোগ থাকবে না তেমনি নাগরিকগণ ঘরে বসে পৌরকর অনলাইনের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন।

চট্টগ্রাম নগরীতে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে ১০ লক্ষাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও বর্তমানে ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা দেড় লক্ষেরও কম। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। কোচিং সেন্টারসহ সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেড লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপন বাবদ রাজস্ব আদায়ের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

“স্বাস্থ্যসম্মত পরিচ্ছন্ন ও স্মার্ট নগরী” গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তারই অংশ হিসাবে Smart City গড়ার লক্ষ্যে Smart LED বাতি স্থাপনের চলমান প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ব ব্যাঙ্কের অর্থায়নে কোভিড-১৯ রেসপন্স ও রিকভারি (LGCRRP) প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৩৫ কি.মি. সড়কে ৫,৫০০টি এলইডি স্মার্ট লাইট স্থাপনকাজ চলমান রয়েছে। ইতোপূর্বে JICA-র অধীনে ৯৪ কি.মি. সড়কে অনুরূপ স্ট্রিট-লাইট স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে মুরাদপুর হতে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নীচে Smart LED বাতি স্থাপন ও ফ্লাইওভারের ওপরে যানবাহনের ঊর্ধ্বগতি রোধকল্পে Speed Camera স্থাপনকাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ ছাড়া Clean, Green, Healthy & Safe City” গড়ার লক্ষ্যে ১৩৫ কি.মি. সড়কে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সোলার ও নন-সোলার Smart Street Light স্থাপনের পাশাপাশি AI Based Camera স্থাপনের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। এই প্রকল্প সড়কে জনগণের মাঝে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অনেকাংশে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। আমাদের প্রতিশ্রুত Safe City বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে নগরীর ৫৩টি মোড়ে Smart Traffic System শীর্ষক প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুতির কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ২১৫ কোটি টাকা।

প্রতিবারের ন্যায় নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের সড়ক বাতির সুইচ অন-অফ কাজে নিয়োজিত ১,৩৪৫ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জনপ্রতি ২,৫০০ টাকা করে ভাতা প্রদান করা হয়েছেÑ যা পরবর্তী অর্থ বছরে জনপ্রতি ৩,০০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন সময়ে মহিলাদের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে বন্দরটিলা মাতৃসদন হাসপাতালে ১,২৫০ কেজি বেড লিফ্ট ও ২০০ কেভিএ নতুন জেনারেটর স্থাপন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং বহদ্দারহাট কাঁচা বাজারে অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র স্থাপনকাজ চলমান রয়েছে।

এ ছাড়াও সিঙ্গাপুর ব্যাঙ্কক মার্কেটে সেন্ট্রাল এসি স্থাপনকাজ সম্পন্ন করাসহ চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্স ও সিঙ্গাপুর ব্যাঙ্কক মার্কেটে নতুন স্কেলেটর স্থাপন কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কর্পোরেশনের অর্থায়নে কিছু উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে ৪১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক এলইডি বাতি দ্বারা আলোকায়নকাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। তা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন টিউব্স লি. ও বিএমটিএফ হতে এলইডি গোল বাল্ব ও টিউব-লাইট দিয়ে ৪১টি ওয়ার্ড পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণকাজ চলমান রয়েছে।
আমাদের সকলের প্রিয় মহানগরীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় “এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন” শীর্ষক ২,৪৯০.৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির আওতায় ৩২৪টি উপ-প্রকল্পে প্রায় ১,৯৩৫ কোটি টাকার অধিক দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ৩১৫টি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। প্রকল্পটির ১২৪টি লটের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় ০৩টি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, ২৫টির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে এয়ারপোর্ট রোডসহ শহরের অন্যান্য সড়কগুলো ফুটপাথসহ দৃষ্টিনন্দন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অধীনে নিয়োজিত কনসালটেন্টের মাধ্যমে কাজগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত হলে এর আওতায় ৭৬৯ কিলোমিটার সড়ক, ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ, ১০টি গোলচত্বর, ১৪টি ব্রিজ, ২২টি কালভার্ট এবং ৬০০ মিটারের একটি ওভারপাস নির্মিত হবে যা এই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

‘‘বহদ্দারহাট বারইপাড়া হতে কর্ণফুলি নদী পর্যন্ত খাল খনন (২য় সংশোধিত)” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১,৩৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে ২.৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে খাল, প্রতিরোধ দেয়াল, রাস্তা এবং ফুটপাথ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ১৪টি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণে নগরীর ১২টি ওয়ার্ড জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের “বিভিন্ন ওয়ার্ডের সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং বাস/ ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ শীর্ষক ১,২৬৮ কোটি টাকা (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পটির আওতায় টার্মিনাল নির্মাণকাজ ছাড়াও সড়ক, ব্রিজ, ফুটপাথ ও কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাস-ট্রাক টার্মিনালটির কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে “পরিচ্ছন্নকর্মী নিবাস” নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ০৭ (সাত)টি ১৪-তলা ভবন এর মধ্যে ০৫ (পাঁচ)টি ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করে প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকি ০২ (দুই)টি ভবনের নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত ২৬.০৪.২০২৬ খ্রি. একনেকে ৩০৯ টাকার রিভাইজড প্রকল্প অনুমোদন হয়। ফলে এ প্রকল্পটি রিভাইজড করে সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (LGED) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্প বরাদ্দ : ২৬৭ কোটি টাকা এবং মেয়াদকাল : জানুয়ারি ২০২৩ হতে ডিসেম্বর ২০২৬ খ্রি. পর্যন্ত। নগরীর প্রায় ২১ কি.মি. সড়ক, ২৮ কি.মি. ড্রেন, ২৬ কি.মি. ফুটপাথ, ৯০ কি. মি. বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন ও ২টি খেলার মাঠের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়াও ৩টি খেলার মাঠের কাজ, ২টি বিল্ডিং-এর কাজসহ সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলমান আছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভৌত কাজে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী সমূহের যথাযথ মান নিরূপণের জন্য সাগরিকায় টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভৌত কাজের গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে এ অর্থ বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকা ল্যাব ফি বাবদ আয় হয়েছে।

নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ, হালিশহর মাঠ, ‘এইচ’ ব্লক মাঠ, বহুরূপী মাঠ, ফিরোজ শাহ মাঠ, মহসিন কলেজ মাঠ, হালিশহর ‘বি’ ব্লক আ/এ মাঠসহ নগরির ৪১টি ওয়ার্ডে ১টি করে খেলার মাঠের উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়াও ৩০টি খেলার মাঠ/পার্ক তৈরির জন্য ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় “এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে প্রকৌশল যান্ত্রিক উপ-বিভাগের জন্য ০১ (এক) ইউনিট জিপ, ০৫ (পাঁচ) ইউনিট থ্রি হুইল রোড রোলার, ০৫ (পাঁচ) ইউনিট ডবল ড্রাম রোড রোলার, ০২ (দুই) ইউনিট ব্যাক হু লোডার, ০২ (দুই) ইউনিট পে-লোডার এবং ০১ (এক) ইউনিট চেন ডোজার ক্রয় করা হয়েছে।

একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতির অকৃত্রিম দানে ধন্য আমাদের এই প্রিয় পর্যটন ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক, সবুজ ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটিতে রূপান্তর করা আমাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। আর এই মহাপরিকল্পনার মূল ভিত্তিস্তম্ভ হলো আমাদের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ। বিগত বছরগুলোতে আমরা শুধু প্রথাগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। নগরীর প্রতিটি স্থানকে আবর্জনামুক্ত রাখা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড়ো হুমকি, বিশেষ করে মশা ও ভেক্টরবাহিত রোগ প্রতিরোধে আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, বর্জ্যের সুষম রিসাইক্লিং এবং পরিচ্ছন্নতার এই ধারাকে আরও বেগবান করতে এবারের ২০২৬-২০২৭ সালের বাজেটে আমরা বেশ কিছু যুগান্তকারী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ এবং অপসারণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্জ্য পরিবহনের জন্য ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১০টি এস.এস. গারবেজ কন্টেইনার ক্রয় করা হয়েছে। ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে চসিক অধীনস্থ প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার সার্ভিস ড্রেন পরিষ্কার এবং ড্রেনে জমে থাকা মাটি ও আবর্জণা অপসারণ করা হয়েছে। ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চসিক অধীনস্থ নগরীর ২৫টি খাল হতে প্রায় ০১ কোটি ঘন ফুটেরও বেশি আবর্জনা ও মাটি উত্তোলন এবং অপসারণ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২২.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ০২টি পে-লোডার, ০২টি হুইল স্কেভেটর, ০২টি লংবুম, ০১টি চেন ডোজার ক্রয় করা হয়েছে। দিনের বেলায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজের পাশাপাশি আবর্জনা অপসারণের কাজ রাতের বেলায় সম্পাদন করা হচ্ছে বিধায় দৃষ্টিকটু আবর্জনা গাড়ি ও দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা অপসারণ দৃশ্যমান হচ্ছে না।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নগরীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেটারনিটি, ডায়াগ্নোস্টিক সেন্টার, ল্যাব ইত্যাদি হতে প্রতিদিন প্রায় ২-৩ টন মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণপূর্বক তা হালিশহর টিজিতে জাইকার অর্থায়নে নির্মিত/ স্থাপিত ইনসিনারেটর-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে প্রত্যহ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। গাড়ির আবর্জনা দ্রুত অপসারণের লক্ষ্যে উন্নতমানের গার্বেজ ট্রিপার এবং কম্পেক্টরের মাধ্যমে প্রধান প্রধান সড়কের আবর্জনা নিয়মিত অপসারণ করা হচ্ছে। নগরীর আবর্জনাসমূহ বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য স্যানিটারি ল্যান্ড ফিল্ড স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন। ৭০ লক্ষ জনগণের এই নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩,২০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। পরিচ্ছন্নতা বিভাগ ৮১% বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করে। শত ভাগ সংগ্রহের লক্ষ্যে ১০টি নতুন ঝঞঝ, ১০টি নতুন এস. এস. কন্টেইনার, ০৭টি স্কেভেটর, পে-লোডার ও লংবুম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে সংযোজন করা হয়েছে।

নগরীর মশক নিধন কাজের মান বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ০৭ জন পরিদর্শক (মশক নিয়ন্ত্রণ) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে সকাল বেলা মশা নিধনকারী লার্ভিসাইড এবং বিকালে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শহরজুড়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে কীটনাশক এবং সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আমেরিকান প্রযুক্তির বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড BTI মহানগর এলাকায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে গত বছরের তুলনায় এই বছর মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চসিক স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কর্নার চালু করা হয়েছে। নাগরিক-সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ০২টি সিএনজি অটোরিকশার মাধ্যমে শহরজুড়ে মাইকিং, তথ্যবহুল লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এডিসের লার্ভা প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নগরবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে। ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত বিশেষ দল দ্বারা ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মশার প্রজনন স্থল ধ্বংস করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি ২০২৪ সালের ০৩ নভেম্বর দায়িত্বগ্রহণ করেছি ৫৯৬ কোটি টাকা দেনা নিয়ে। বর্তমানে দেনার পরিমাণ কমে ৩৮০ কোটি টাকা হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে আয়কর বাবদ ৪৭ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ ৮৬ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল বাবদ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ও ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৩০ কোটি টাকা এবং আনুতোষিক বাবদ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ২০ কোটি টাকা ও ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে জনপ্রতি ১ লক্ষ টাকা করে ৪২০ জনকে ৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকা আনুতোষিক প্রদান করা হচ্ছে, যা চলমান থাকবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদিত জাইকার সহযোগিতায় আধুনিক BACS-ভিত্তিক বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ ও বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। সবক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আমি কাজ করার চেষ্টা করছি। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমি ভালোবাসি।

 

মন্তব্য করুন