২৩তম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল-অলি আহমদ

মোহাম্মদ মাসুদ: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচনে জনমনে কৌতূহল, রাজনৈতিক অঙ্গনে নজর, সংস্কার বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নতুন বিতর্ক, প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা, তবে রাজনৈতিক সমীকরণে ফখরুল এগিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা জল্পনা কল্পনা রাজনৈতিক মহল সর্বস্তরের মানুষের মাঝে।

রাষ্ট্রপতি পদে এবার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) বিএনপির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে কয়েক দিনের রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল।

অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনুষ্ঠানিক রূপ স্পষ্ট হয়েছে। অলি আহমদ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতির সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। পরবর্তীতে তিনি এলডিপি গঠন করেন এবং বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সক্রিয়।

প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা: নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১-এর অধীনেই নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন।

এ কারণে অলি আহমদ ও মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মতো জনসাধারণের সরাসরি ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং সংসদ সদস্যদের ভোটেই চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পর দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকলে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিক সমীকরণে ফখরুল এগিয়ে: সংসদে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থান স্পষ্টতই সুবিধাজনক। এ কারণে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তার রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত এমন বিশ্লেষণও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে অলি আহমদের প্রার্থিতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে নিছক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বাড়িয়েছে। ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাকে প্রার্থী করা জোটটির রাজনৈতিক অবস্থান ও সংস্কার-সংক্রান্ত দাবিরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংস্কার বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন -নতুন বিতর্ক: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং সংসদীয় কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় নির্ধারণ ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট -সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার বিধান নয়। এই অনুচ্ছেদ দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দলত্যাগ বা দলবিরোধী ভোটের ক্ষেত্রে সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার বিধান নিয়ে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং তার সময়সীমার সাংবিধানিক ভিত্তি মূলত ৪৮ ও ১২৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত।

জনমনে কৌতূহল, রাজনৈতিক অঙ্গনে নজর: রাষ্ট্রপতি পদ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদার পদ হওয়ায় এবারের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিবের প্রার্থিতা এবং ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের মনোনয়ন-দুই প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নির্বাচনটি ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

এখন মূল নজর নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়া এবং সংসদ সদস্যদের ভোটের ওপর। দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকলে ২০ আগস্টের ভোটই নির্ধারণ করবে-কে হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

রাজনৈতিক উত্তাপ, সংস্কারের বিতর্ক এবং দুই প্রবীণ নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা- সব মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য : সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৪৮’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। আর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ‘অনুচ্ছেদ ১২৩’-এ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ‘অনুচ্ছেদ ৭০’ মূলত দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দলবিরোধী ভোটের কারণে আসন হারানোর বিষয়-এটি সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান নয়।

মন্তব্য করুন