
*চট্টগ্রাম রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় দপ্তরের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় এক বছর আট মাস তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তাঁর অনুপস্থিতির সময়কে ছুটি হিসেবে গণ্য করে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়।**
জুবায়েরুল ইসলাম নামের ওই কর্মচারী রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বাবা সিবাজুল ইসলাম রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সময় থেকে জুবায়েরুল ইসলাম কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁর বেতন-ভাতা চালু ছিল। এমনকি অনুপস্থিতির দীর্ঘ সময় পার হলেও তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জুবায়েরুলের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে তাঁর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং অনুপস্থিতির সময়কে বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অনুপস্থিতির সময়কে ছুটি হিসেবে দেখিয়ে তাঁকে কাজে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার পরও চাকরি বহাল রাখার বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
### রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবের অভিযোগ
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অতীতেও জুবায়েরুল ইসলাম দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হয়ে প্রভাব খাটানো, বিরোধীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে জুবায়েরুল ইসলামের বক্তব্যও প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি নিয়মিত অফিস না করেও প্রভাব খাটিয়ে চলতেন। কর্মস্থলে বসে ব্যক্তিগত কাজ করতেন এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
### বাবার বিরুদ্ধেও হত্যা মামলার অভিযোগ
জুবায়েরুল ইসলামের বাবা সিবাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে একটি হত্যা মামলা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন।
তবে মামলার নম্বর, ধারাসমূহ, আদালতের জামিন আদেশ এবং মামলায় তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
### সমিতির নেতার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
জুবায়েরুল ইসলামের চাকরি ও অনুপস্থিতির বিষয়টি নিষ্পত্তিতে রেলওয়ের একটি শ্রমিক সংগঠনের নেতার প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংগঠনের সভাপতি ও সচিবের প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ক্ষেত্রে সংগঠনের সচিব সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে জুবায়েরুলের পক্ষে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে **ঘুষ লেনদেনের এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা জরুরি।**
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে প্রশ্ন হলো—একজন কর্মচারী দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পর তাঁর বিরুদ্ধে কী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, অনুপস্থিতির সময় কীভাবে ছুটি হিসেবে অনুমোদিত হলো এবং ওই সময়ে তিনি বেতন-ভাতা পেয়েছেন কি না।
### তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
রেলওয়ের প্রশাসনিক নথি, হাজিরা খাতা, বেতন বিল, ছুটির আবেদন, বিভাগীয় শাস্তির আদেশ এবং চাকরিতে পুনরায় যোগদানের অনুমোদনপত্র পর্যালোচনা করলে অভিযোগের সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তাঁর চাকরিতে যোগদানের তারিখ পর্যন্ত **কত দিন তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, ওই সময়ে কত টাকা বেতন-ভাতা নিয়েছেন, অনুপস্থিতির জন্য কে ছুটি অনুমোদন করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা হয়েছিল কি না**—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিতেই থাকার কথা।
এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জুবায়েরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি ও সচিব এবং রেলওয়ের প্রশাসন শাখার বক্তব্য নিয়ে অভিযোগগুলো যাচাই করা হলে প্রতিবেদনটি আরও শক্ত হবে।








