নিউজ ডেস্ক

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু’র ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, আমাদের যুদ্ধ!

বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমেদ: পাকিস্তান আমলে সক্রিয় ছাত্রকর্মী হিসেবে ছাত্র সমাজের ১১ দফা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। পরবর্তীতে ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ইয়াহিয়া খানের নানামুখী ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করে বাঙালী জাতিকে দাবিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাঙ্গালী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একজন ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা ছিলাম। এছাড়াও চাকুরীতে যোগদানের আগ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন এবং শ্রমিক সংগ্রামে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আজ পাঠকদের জন্য আমার ছাত্রজীবন ও যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করছি। আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ পিতা- মনোহর আলী, মাতা- ছবুরা খাতুন, গ্রাম- তেকোটা, ডাকঘর- গৈড়লা, উপজেলা পটিয়া, জিলা- চট্টগ্রাম। আমি কৃষক পরিবারের সন্তান, পরিবার কৃষি আয়ের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। বাবা মনোহর আলী কৃষক হলেও তিনি ছিলেন গ্রামের মাতব্বর। তার কথায় গ্রাম ও সমাজ চলতো। তিনি একজন কৃষক সমিতির নেতাও ছিলেন। পাঁচ ভাই, চার বোনের মধ্যে আমিই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। আমি গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি, পটিয়া সরকারী কলেজ হতে এইচএসসি ও ডিগ্রী পাশ করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাজনীতি বিজ্ঞানে এমএ পাশ করি, চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যায়ন করি। ছাত্র জীবনের শুরু হতে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হই। তবে সাংগঠনিক ভাবে ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হই এবং একই সাথে সে সময়ের গোপন সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি’র সংস্পর্শে আসি। তৎসময়ে ১৯৬৮ সালে ছাত্র ইউনিয়ন পশ্চিম পটিয়া আঞ্চলিক শাখার সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ১৯৭১ সনে পটিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ছাত্র ইউনিয়নের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসাবে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়াও তখন কৃষক সমিতির কাজেও জড়িয়ে পড়ি। কৃষকদের নানা সমস্যা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কৃষক নেতাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ন্যাপের মনোনয়ন প্রার্থী আনোয়ারা থানার এডভোকেট আবদুল জলিলের নির্বাচন পরিচালনার জন্য আমাকে আনোয়ারায় পাঠান। আনোয়ারায় প্রায় ৩ দিন অবস্থান করি এবং সুচারুভাবে নির্বাচনী কাজ পরিচালনা করি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হন্তান্তরে পাকিস্তানী সামরিক শাসক ইয়াহিয়া গড়িমশি শুরু করলে তখন দেশে প্রতিনিয়ত শহর গ্রামে সভা সমাবেশ মিছিল চলতে থাকে। এতে জনগণের মধ্যে মারাত্মক উত্তেজনা দেখা দেয়। ১৯৭১ এর শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছিল। ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে ইয়াহিয়া অধিবেশন বন্ধ করে দেন। উক্ত অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান হতে ন্যাপের আবদুল ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাপের এমপি’রা ঢাকায় আসলেও পাকিস্তানি পিপলস পার্টি’র এমপিরা ঢাকায় আসেনি ভুট্টোর এমপিরা সংসদ অধিবেশন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় সংসদ অধিবেশ না বসায় পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী জনগণের মধ্যে তীব্র উত্তজেনা দেখা দেয়। দিন রাত মিছিল সমাবেশ চলতে থাকে। তখন শ্লোগান উঠে জাগো জাগো বাঙালী জাগো। বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো। তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, এক দফা এক দাবী পূর্ব বাংলা স্বাধীন চাই। যা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে উচ্চারণ করে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’। দেশে টান টান উত্তেজনা, দেশে কি হবে কি হবে তা নিয়ে মানুষের চোখে ঘুম নেই। ৭ মার্চের ঘোষণার পর মূলত: রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মানুষের দাবী তখন এক দফা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা।
এই লড়াই সংগ্রামের ভেতর পাক সরকার সাময়িক সমাধানের দিকে নাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আনতে থাকে। চট্টগ্রাম সোয়াত জাহাজে অস্ত্র আনার সংবাদ পেয়ে চট্টগ্রামের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। যার যা আছে লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। মেজর জিয়ার উপর দায়িত্ব ছিলো সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের। এই খবর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনগণের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় তখন চট্টগ্রাম শহরে রাস্তায় রাস্তায় সার্বক্ষণিক হাজার হাজার মানুষ। আগ্রাবাদ মেইন রোডে মানুষের পাহারা, সকাল বেলা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে কিছু সংখ্যক সৈনিক আগ্রাবাদ রাস্তা দিয়ে সোয়াত জাহাজের দিকে রওনা হলে হোটেল সেন্ট মার্টিনের এলাকায় রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং মেজর জিয়াকে বন্দরের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় গ্রেপ্তারের আগেই বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেশ বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। উক্ত বার্তা চট্টগ্রাম এসে পৌঁছে। ২৫ মার্চ মধ্য রাতেই পাকিস্তানী সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেন এবং ঢাকার রাজারবাগ-পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সহ ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন পাক বাহিনী। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রামে ক্যাপ্টন রফিকুল ইসলাম ইপিআর বাঙালী সৈনিক নিয়ে বিদ্রোহ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানী সৈনিকদের প্রতিরোধ করেন। কিছু দিনের মধ্যে পাকিস্তানী সৈনিকদের হাতে চট্টগ্রাম শহরের পতন হলে শহরের মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যেতে থাকে।
এমতাবস্থায়, এলাকার যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে গৈড়লা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে থাকার নেতৃত্বে শত শত যুবকদের সকলবেলা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। সামশুজ্জামান হীরা ভাইয়ের ১টি পয়েন্ট ২২ রাইফেল ছিল এবং ১ জন ইপিআর এর ১টি রাইফেল ছিলো। এভাবে ট্রেনিং ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলে ১৯ তারিখ শুক্রবার বেলা ১১টায় পটিয়া থানা মোড়ে পাকিস্তানী বাহিনী বিমান হামলা করে এতে অনেক লোক হতাহত হন। বিমান হামলার পর আমাদের ট্রেনিং বন্ধ হয়ে যায়। মুলত: এপ্রিল থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম পাক বাহিনী ও তাদের দোসর মুসলিমলীগের দখলে চলে যাওয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য প্রগতিশীল নেতারা ইতিমধ্যে সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন আমাদের নেতারাও অনেকে ভারতে।
১৯৭১ এর এপ্রিলের শেষে আমাদের প্রিয় নেতা কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগোয় আমাকে ও সুজিত বড়–য়াকে আমাদের গ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরে গোপনে বৈঠক করে জানালেন যে, ভারতে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা হচ্ছে, তাই আমাদের ভারতে যেতে হবে। কথা মত দুই দিন আমি ও সুজিত ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গোমদন্ডী বকতেয়ার নোমানির বাড়ীতে যাই। সেখান থেকে গাইডার আমাদের নেয়ার কথা। কিন্তু ঐ দিকে বিকেলে খবর আসে আমাদের নেতা পূর্ণেন্দু কানুনগো কর্ণফুলী নদী পাড় হওয়ার সময় মুসলিমলীগের দালালদের হাতে ধরা পড়েছে। এর কয়েক দিন পর কমরেড কানুনগো দালালদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমার নিকট আসে। বিকল্প পথে অর্থাৎ, মিরশ্বরাই হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন এবং যাওয়ার বিষয়ে সবিস্তারে ব্রীফ করেন। তার নিদের্শনা মোতাবেক অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে মিরশ্বরাই ফেনী দিয়ে চৌদ্দগ্রাম, চৌদ্দগ্রামে রাতযাপন করি কাজী বাড়ীতে। পরদিন সকাল বেলা চৌদ্দগ্রাম জগতনাথ দীঘির পাশ দিয়ে বেলোনীয়া বর্ডার অতিক্রম করি। বেলোনী শহরে সিপিআই ক্যাম্পে রাত যাপনের পর পরদিন আগরতলা ক্রেপ্ট হোস্টেল পৌঁছি। সেখানে দেখি সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দ অবস্থান করছেন। ক্রেপ্ট হোস্টেলে বেগম মতিয়া চৌধুরী আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমরা ভাত খেয়ে সেখান থেকে একটি স্কুলে যাই, সেখানে দেখি ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়েনের কয়েকশত নেতা কর্মচারী অবস্থান করছেন। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর অধ্যাপক মাহাবুবুল হকের পরিচালনায় বি.এস হোস্টেলে দুই দিন পর রশিদ আসলেন এবং সবাইকে নীচে নেমে লাইন ধরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি আমাদের ব্রীফ করলেন এবং বললেন আমাদের চূড়ান্ত ট্রেনিং এর জন্য পাঠানো হচ্ছে। তাই তিনি আমাদের জাতীয় পতাকা দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ী এসে আমাদের আগরতলা বিমান বন্দরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দাঁড়ানো ছিলো রাশিয়ার একটি কার্গো বিমান। সে বিমানে করে আমাদের আসাম সামরিক বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে সামরিক বাহিনীর গাড়ীতে করে তেজপুর সেনা নিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে আমাদের দুই মাসের বেশী সময় গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, ট্রেনিং শেষে ত্রিপুরা বাইকোরা নামক স্থানে ক্যাম্পে আশা হয় কয়েক দিন পর সাবরুম বর্ডার হয়ে ভারতীয় বর্ডার গার্ডের সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করি। বর্ডার পার হয়ে চাকমা উপজাতীয়দের সহযোগিতায় আমাদের সমস্ত গোলা বারুদ বহন করেন তারা, তাদের মাধ্যমে ফটিকছড়ি নারায়ণ হাট হয়ে বোয়ালখালী চলে আসি। বোয়ালখালী থেকে যে দিন পটিয়া গোপাল পড়া প্রবেশ করি, সেদিন সকাল বেলা আমাদের সাথে পাক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাক বাহিনীর সহযোগী কয়েকজন মারা গেলেও আমাদের কেউ হতাহত হননি।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর হতে করলডেঙ্গা রসহরী মহাজনের বাড়ীতে ক্যাম্প এবং করলডেঙ্গা পাহাড়ে ছালতাছড়ি নামক স্থানে ট্রেনিং সেন্টার করে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে ধলঘাট ষ্টেশন দখলের যুদ্ধ, ইন্দ্রপুল ধ্বংস করা, গৈড়লার টেকে ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জয় লাভ, পটিয়া থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন সহ আরো অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।
কমরেড শাহ আলমের নেতৃত্বে ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ১৯ জন গেরিলা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও স্থানীয় ভাবে করলডেঙ্গা পাহাড়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিরাট গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর পটিয়া স্বেচ্ছাসেবক বিগ্রেড প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করি। ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পটিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষে প্রথমে চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগে চাকুরী করি। এরপর ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দান করি। (বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত)।
সংসার জীবনে আমার চারকন্যা, বড় মেয়ে সাবরিনা বিনতে আহমদ (সাকী), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমবিএ পাশ করে, ২য় মেয়ে সায়মুনা জেসমিন পিংকি এমবিবিএস (বিসিএস) ডাক্তার, ৩য় মেয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর কম্পিউটার স্নাতকত্তোর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আমেরিকার মিসিগান স্ট্রেট ইউনিভার্সিটি হতে এমএস করেন ও উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। ৪র্থ মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অনার্সে অধ্যায়নরত। স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার। বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছে সমাজের জন্য। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের ২০ বছর কমান্ডার ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের সভাপতি, চট্টগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ এর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধকালিন ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার সদস্য সচিব হিসেবে আছি। চট্টগ্রাম নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমার রাজনৈতিক গুরু মাস্টার আবদুস সালাম।
উল্লেখ্য যে, আমার গেরিলা দলে ছিলেন কমরেড শাহ আলম, সামশুজ্জামান হীরা, মো: ইউছুপ, কাজী আনোয়ার, নজরুল ইসলাম, শেখর দস্তিদার, পুলক দাশ, তপন দস্তিদার, মো: আলী, মোয়াজ্জেম হোসেন, কামরুজ্জামান, সুজিত বড়–য়া, প্রিয়তোষ বড়–য়া, ভূপাল দাশ, মিয়া জাফর আহমদ, গোলাম মাওলা প্রমুখ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সহ-সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ , সভাপতি, চট্টগ্রাম প্রাতিষ্ঠানিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতি লিঃ। সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর।
স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু’র ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, আমাদের যুদ্ধ
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমেদ: পাকিস্তান আমলে সক্রিয় ছাত্রকর্মী হিসেবে ছাত্র সমাজের ১১ দফা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। পরবর্তীতে ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ইয়াহিয়া খানের নানামুখী ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করে বাঙালী জাতিকে দাবিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাঙ্গালী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একজন ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা ছিলাম। এছাড়াও চাকুরীতে যোগদানের আগ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন এবং শ্রমিক সংগ্রামে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আজ পাঠকদের জন্য আমার ছাত্রজীবন ও যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করছি। আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ পিতা- মনোহর আলী, মাতা- ছবুরা খাতুন, গ্রাম- তেকোটা, ডাকঘর- গৈড়লা, উপজেলা পটিয়া, জিলা- চট্টগ্রাম। আমি কৃষক পরিবারের সন্তান, পরিবার কৃষি আয়ের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। বাবা মনোহর আলী কৃষক হলেও তিনি ছিলেন গ্রামের মাতব্বর। তার কথায় গ্রাম ও সমাজ চলতো। তিনি একজন কৃষক সমিতির নেতাও ছিলেন। পাঁচ ভাই, চার বোনের মধ্যে আমিই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। আমি গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি, পটিয়া সরকারী কলেজ হতে এইচএসসি ও ডিগ্রী পাশ করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাজনীতি বিজ্ঞানে এমএ পাশ করি, চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যায়ন করি। ছাত্র জীবনের শুরু হতে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হই। তবে সাংগঠনিক ভাবে ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হই এবং একই সাথে সে সময়ের গোপন সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি’র সংস্পর্শে আসি। তৎসময়ে ১৯৬৮ সালে ছাত্র ইউনিয়ন পশ্চিম পটিয়া আঞ্চলিক শাখার সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ১৯৭১ সনে পটিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ছাত্র ইউনিয়নের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসাবে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়াও তখন কৃষক সমিতির কাজেও জড়িয়ে পড়ি। কৃষকদের নানা সমস্যা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কৃষক নেতাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ন্যাপের মনোনয়ন প্রার্থী আনোয়ারা থানার এডভোকেট আবদুল জলিলের নির্বাচন পরিচালনার জন্য আমাকে আনোয়ারায় পাঠান। আনোয়ারায় প্রায় ৩ দিন অবস্থান করি এবং সুচারুভাবে নির্বাচনী কাজ পরিচালনা করি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হন্তান্তরে পাকিস্তানী সামরিক শাসক ইয়াহিয়া গড়িমশি শুরু করলে তখন দেশে প্রতিনিয়ত শহর গ্রামে সভা সমাবেশ মিছিল চলতে থাকে। এতে জনগণের মধ্যে মারাত্মক উত্তেজনা দেখা দেয়। ১৯৭১ এর শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছিল। ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে ইয়াহিয়া অধিবেশন বন্ধ করে দেন। উক্ত অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান হতে ন্যাপের আবদুল ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাপের এমপি’রা ঢাকায় আসলেও পাকিস্তানি পিপলস পার্টি’র এমপিরা ঢাকায় আসেনি ভুট্টোর এমপিরা সংসদ অধিবেশন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় সংসদ অধিবেশ না বসায় পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী জনগণের মধ্যে তীব্র উত্তজেনা দেখা দেয়। দিন রাত মিছিল সমাবেশ চলতে থাকে। তখন শ্লোগান উঠে জাগো জাগো বাঙালী জাগো। বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো। তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, এক দফা এক দাবী পূর্ব বাংলা স্বাধীন চাই। যা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে উচ্চারণ করে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’। দেশে টান টান উত্তেজনা, দেশে কি হবে কি হবে তা নিয়ে মানুষের চোখে ঘুম নেই। ৭ মার্চের ঘোষণার পর মূলত: রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মানুষের দাবী তখন এক দফা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা।
এই লড়াই সংগ্রামের ভেতর পাক সরকার সাময়িক সমাধানের দিকে নাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আনতে থাকে। চট্টগ্রাম সোয়াত জাহাজে অস্ত্র আনার সংবাদ পেয়ে চট্টগ্রামের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। যার যা আছে লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। মেজর জিয়ার উপর দায়িত্ব ছিলো সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের। এই খবর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনগণের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় তখন চট্টগ্রাম শহরে রাস্তায় রাস্তায় সার্বক্ষণিক হাজার হাজার মানুষ। আগ্রাবাদ মেইন রোডে মানুষের পাহারা, সকাল বেলা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে কিছু সংখ্যক সৈনিক আগ্রাবাদ রাস্তা দিয়ে সোয়াত জাহাজের দিকে রওনা হলে হোটেল সেন্ট মার্টিনের এলাকায় রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং মেজর জিয়াকে বন্দরের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় গ্রেপ্তারের আগেই বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেশ বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। উক্ত বার্তা চট্টগ্রাম এসে পৌঁছে। ২৫ মার্চ মধ্য রাতেই পাকিস্তানী সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেন এবং ঢাকার রাজারবাগ-পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সহ ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন পাক বাহিনী। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রামে ক্যাপ্টন রফিকুল ইসলাম ইপিআর বাঙালী সৈনিক নিয়ে বিদ্রোহ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানী সৈনিকদের প্রতিরোধ করেন। কিছু দিনের মধ্যে পাকিস্তানী সৈনিকদের হাতে চট্টগ্রাম শহরের পতন হলে শহরের মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যেতে থাকে।
এমতাবস্থায়, এলাকার যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে গৈড়লা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে থাকার নেতৃত্বে শত শত যুবকদের সকলবেলা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। সামশুজ্জামান হীরা ভাইয়ের ১টি পয়েন্ট ২২ রাইফেল ছিল এবং ১ জন ইপিআর এর ১টি রাইফেল ছিলো। এভাবে ট্রেনিং ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলে ১৯ তারিখ শুক্রবার বেলা ১১টায় পটিয়া থানা মোড়ে পাকিস্তানী বাহিনী বিমান হামলা করে এতে অনেক লোক হতাহত হন। বিমান হামলার পর আমাদের ট্রেনিং বন্ধ হয়ে যায়। মুলত: এপ্রিল থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম পাক বাহিনী ও তাদের দোসর মুসলিমলীগের দখলে চলে যাওয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য প্রগতিশীল নেতারা ইতিমধ্যে সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন আমাদের নেতারাও অনেকে ভারতে।
১৯৭১ এর এপ্রিলের শেষে আমাদের প্রিয় নেতা কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগোয় আমাকে ও সুজিত বড়–য়াকে আমাদের গ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরে গোপনে বৈঠক করে জানালেন যে, ভারতে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা হচ্ছে, তাই আমাদের ভারতে যেতে হবে। কথা মত দুই দিন আমি ও সুজিত ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গোমদন্ডী বকতেয়ার নোমানির বাড়ীতে যাই। সেখান থেকে গাইডার আমাদের নেয়ার কথা। কিন্তু ঐ দিকে বিকেলে খবর আসে আমাদের নেতা পূর্ণেন্দু কানুনগো কর্ণফুলী নদী পাড় হওয়ার সময় মুসলিমলীগের দালালদের হাতে ধরা পড়েছে। এর কয়েক দিন পর কমরেড কানুনগো দালালদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমার নিকট আসে। বিকল্প পথে অর্থাৎ, মিরশ্বরাই হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন এবং যাওয়ার বিষয়ে সবিস্তারে ব্রীফ করেন। তার নিদের্শনা মোতাবেক অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে মিরশ্বরাই ফেনী দিয়ে চৌদ্দগ্রাম, চৌদ্দগ্রামে রাতযাপন করি কাজী বাড়ীতে। পরদিন সকাল বেলা চৌদ্দগ্রাম জগতনাথ দীঘির পাশ দিয়ে বেলোনীয়া বর্ডার অতিক্রম করি। বেলোনী শহরে সিপিআই ক্যাম্পে রাত যাপনের পর পরদিন আগরতলা ক্রেপ্ট হোস্টেল পৌঁছি। সেখানে দেখি সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দ অবস্থান করছেন। ক্রেপ্ট হোস্টেলে বেগম মতিয়া চৌধুরী আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমরা ভাত খেয়ে সেখান থেকে একটি স্কুলে যাই, সেখানে দেখি ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়েনের কয়েকশত নেতা কর্মচারী অবস্থান করছেন। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর অধ্যাপক মাহাবুবুল হকের পরিচালনায় বি.এস হোস্টেলে দুই দিন পর রশিদ আসলেন এবং সবাইকে নীচে নেমে লাইন ধরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি আমাদের ব্রীফ করলেন এবং বললেন আমাদের চূড়ান্ত ট্রেনিং এর জন্য পাঠানো হচ্ছে। তাই তিনি আমাদের জাতীয় পতাকা দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ী এসে আমাদের আগরতলা বিমান বন্দরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দাঁড়ানো ছিলো রাশিয়ার একটি কার্গো বিমান। সে বিমানে করে আমাদের আসাম সামরিক বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে সামরিক বাহিনীর গাড়ীতে করে তেজপুর সেনা নিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে আমাদের দুই মাসের বেশী সময় গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, ট্রেনিং শেষে ত্রিপুরা বাইকোরা নামক স্থানে ক্যাম্পে আশা হয় কয়েক দিন পর সাবরুম বর্ডার হয়ে ভারতীয় বর্ডার গার্ডের সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করি। বর্ডার পার হয়ে চাকমা উপজাতীয়দের সহযোগিতায় আমাদের সমস্ত গোলা বারুদ বহন করেন তারা, তাদের মাধ্যমে ফটিকছড়ি নারায়ণ হাট হয়ে বোয়ালখালী চলে আসি। বোয়ালখালী থেকে যে দিন পটিয়া গোপাল পড়া প্রবেশ করি, সেদিন সকাল বেলা আমাদের সাথে পাক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাক বাহিনীর সহযোগী কয়েকজন মারা গেলেও আমাদের কেউ হতাহত হননি।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর হতে করলডেঙ্গা রসহরী মহাজনের বাড়ীতে ক্যাম্প এবং করলডেঙ্গা পাহাড়ে ছালতাছড়ি নামক স্থানে ট্রেনিং সেন্টার করে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে ধলঘাট ষ্টেশন দখলের যুদ্ধ, ইন্দ্রপুল ধ্বংস করা, গৈড়লার টেকে ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জয় লাভ, পটিয়া থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন সহ আরো অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।
কমরেড শাহ আলমের নেতৃত্বে ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ১৯ জন গেরিলা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও স্থানীয় ভাবে করলডেঙ্গা পাহাড়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিরাট গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর পটিয়া স্বেচ্ছাসেবক বিগ্রেড প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করি। ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পটিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষে প্রথমে চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগে চাকুরী করি। এরপর ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দান করি। (বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত)।
সংসার জীবনে আমার চারকন্যা, বড় মেয়ে সাবরিনা বিনতে আহমদ (সাকী), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমবিএ পাশ করে, ২য় মেয়ে সায়মুনা জেসমিন পিংকি এমবিবিএস (বিসিএস) ডাক্তার, ৩য় মেয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর কম্পিউটার স্নাতকত্তোর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আমেরিকার মিসিগান স্ট্রেট ইউনিভার্সিটি হতে এমএস করেন ও উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। ৪র্থ মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অনার্সে অধ্যায়নরত। স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার। বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছে সমাজের জন্য। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের ২০ বছর কমান্ডার ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের সভাপতি, চট্টগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ এর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধকালিন ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার সদস্য সচিব হিসেবে আছি। চট্টগ্রাম নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমার রাজনৈতিক গুরু মাস্টার আবদুস সালাম।
উল্লেখ্য যে, আমার গেরিলা দলে ছিলেন কমরেড শাহ আলম, সামশুজ্জামান হীরা, মো: ইউছুপ, কাজী আনোয়ার, নজরুল ইসলাম, শেখর দস্তিদার, পুলক দাশ, তপন দস্তিদার, মো: আলী, মোয়াজ্জেম হোসেন, কামরুজ্জামান, সুজিত বড়–য়া, প্রিয়তোষ বড়–য়া, ভূপাল দাশ, মিয়া জাফর আহমদ, গোলাম মাওলা প্রমুখ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সহ-সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ , সভাপতি, চট্টগ্রাম প্রাতিষ্ঠানিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতি লিঃ। সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর।

মন্তব্য করুন