নিউজ ডেস্ক

মাহমুদুল হাসান নিজামীর কবিতা- গানে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বানী

ফজিলা ফয়েজ: মাহমুদুল হাসান নিজামীর কবিতা- গানে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বানী নিয়ে সার্বজনীনতা ও মানুষের সমতা নিয়ে, তার কবিতাগুলি সহজে মানুষের মনে প্রবেশ করে এবং সমসাময়িক সমস্যা ও মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করে।
মাহমুদুল হাসান নিজামী, তার কাব্যিক দক্ষতা এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ গানের জন্য সুপরিচিত, তার গানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সার্বজনীনতার বিষয়বস্তু খুঁজে পাওয়া যায়। তার কাব্যিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে, তিনি অন্তর্ভুক্তি, সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার জন্য সমর্থন করেন।

তার কবিতা গানে অসাম্প্রদায়িকতা এবং সার্বজনীনতা একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতা রচনা করেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমতা ও সম্পর্কের গুরুত্ব উল্লেখ করেন। নিজামীর গানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাথে মিশে যায়। তিনি অসংখ্য গানে মানুষের ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন যা সামাজিক সংস্কৃতির ভেতর গভীরভাবে প্রবেশ করে।
মাহমুদুল হাসান নিজামীর গান সাম্প্রদায়িকতা ও সর্বজনীনতা নিয়ে এক নতুন পরিবর্তনের লক্ষ্যে মানুষের মনে আলোক এবং সাহায্য করে। তার গানের মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতির সাথে আত্মিকভাবে সংযোগ করে, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ ও সচেতন হয়ে উঠে তার গানের মাধ্যমে।

তার কবিতা “মানুষ জিন্দাবাদ” অসাম্প্রদায়িকতা এবং মানবতার কথা নিয়ে অত্যন্ত বিশেষ আলোচিত। এই কবিতাতে তিনি আধুনিক সমাজের মানবাধিকারের বিষয়ে কথা বলেন।
প্রথম চরণে লেখক মানুষের শ্রেষ্টতা এবং বিবেক বুদ্ধির গুরুত্ব নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছেন।

“বর্ণে নহে কর্মে- ধর্মে নহে- হোক বিচার
সব মানুষই হলো সৃষ্টি এক মহা কর্তার
সারা পৃথিবীর সব মানুষের গড়ন যদি হয় এক
মানুষে মানুষে ব্যাবধান নহে-ইহাই বলিবে বিবেক
মানুষ কেন শ্রেষ্ট বলি অন্য প্রাণির চেয়ে
শ্রেষ্ট হলো মানুষ তবে বিবেক বুদ্ধি নিয়ে
বিবেক যখন হারায় মানুষ পশুর চেয়েও অধম
নস্টামী করতে পারে পশুর চেয়েও চরম”

তিনি বলছেন যে, মানুষ একটি মহা সৃষ্টির অংশ, এবং সব মানুষের মধ্যে যদি একটি গড়ন হয় তবে মানুষের মধ্যে ব্যাবধান হবে না। এছাড়া, মানুষ বিবেক বুদ্ধির সহিত সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে শ্রেষ্ট হলেও, যখন বিবেক হারায়, মানুষ পশুর চেয়ে অধম হয়, যাতে সমাজে নানা ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। এই প্রসঙ্গে লেখক মানুষের বিবেক বুদ্ধির গুরুত্ব এবং সমাজে নাস্টিকরণের বিরুদ্ধে একটি অপূর্ব উত্তালনা করছেন।
দ্বিতীয় চরণের মধ্যে মানুষের মহত্ব, সমতা ও বিবেকের গুরুত্ব উল্লেখ করেন।

“মানুষের বিচার মানুষে করে মানুষ মানুষে কাঁদায়
অবিচার করে মানুষের প্রতি বোধ যখনি বিদায়
ধর্মে বর্ণে ব্যাবধান নহে মানুষ জিন্দাবাদ
মানবতার গাহিবো গান গাহি সাম্যবাদ।”

কবি নিজামীর কবিতায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক মানুষ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম অধিকার এবং বৈচিত্র্যের ধারণা স্থাপন করে। এটি গান বা কবিতার রূপে প্রকাশ পাওয়া যেতে পারে নিজামী র কবিতায়। উক্ত কাব্যবানিতে মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, সম্পর্ক, ও সহানুভূতির গুরুত্ব বোঝায় এবং উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রবোধনমূলক বাণী, যা মানুষের মধ্যে মানবিকতা এবং সহানুভূতির মতো মানবতার মূল্যবান মানদণ্ড স্থাপন করে।

এছাড়াও ধর্মের বিভাজন ও সামাজিক বিস্ফোরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং এটি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর জন্য কবি নিজামী অন্যথায় চমকপ্রদভাবে কবিতা রচনা করেন।

“মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির ভেঙ্গে হয়ে গেছিস তুই মহাবীর
আল্লাহ ঈশ্বর হৃদয়ে থাকে বিশ্বাসের মহাফিকির।
আল্লাহ যিনি ঈশ্বর তিনি মহাস্রষ্টা এই ধরনীর
হৃদয় মাঝে চিরন্তনী আস্থার ঐ মহা জায়গীর।
আল্লার ঘর মসজিদ ভাঙ্গিলে কষ্ট পাবেন ঈশ্বর যিনি
আল্লাহ গড ভগবান একই মহান চিরন্তনী।
যুগে যুগে এসেছেন কতো ঈশ্বর দূত অবতার
আল্লাহ ঈশ্বর ভগবানের বন্দনা আর করিতে প্রচার।
খোদার ঘরে হাতুড়ী মেরে খুশী করিস ঈশ্বরে?
মসজিদ গির্জায় যিনি থাকেন স্রষ্টা তিনিই মন্দিরে।
ধর্মব্যবসায় ধর্মগুরু ভাগ করিলি ধর্মটারে
সকল সৃষ্টির স্রষ্টা যিনি ভাগ করিবে কেমনে তারে”

ধর্মীয় স্থানগুলি মসজিদ, মন্দির বা গির্জা, মানুষের বিশ্বাসের এক অংশ এবং সামাজিক, আধ্যাত্মিক জীবনের গঠনের অনুষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই কবিতা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহিষ্ণুতা ও সামঞ্জস্য উপস্থাপন করছে যেখানে প্রত্যেকটি ধর্মই একই প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এটি ধর্মের মধ্যে সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা উপস্থাপন করে মতামত ও ধারণা বিস্তারিত বিবেচনা করে। সাধারণভাবে বিভিন্ন ধর্মের অন্তর্ভুক্ততা ও সহযোগিতার গুরুত্ব উপস্থাপন করে সমতুল্য পূজা এবং সম্প্রদায়ের আদর্শ সূচি উপস্থাপন করে। ধর্মের মধ্যে ইতর মতাদর্শ ও ধারণার মধ্যে সহযোগিতার একটি উদাহরণ দেয়া হয়েছে। কবি নিজামী র এই ধরনের সাহসিক কবিতা পরস্পর ভিন্ন ধর্মীয় সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা বিষয়ে মানুষের চেতনা জাগ্রত করতে পারে, তাহলে সমাজে সব ধর্মের মধ্যে সামাজিক প্রগতি বজায় রাখা সম্ভব হবে।

বিশিষ্ট কবি গবেষক, ভাষাতত্ববিদ মাহমুদুল হাসান নিজামী ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সমতার ডাক দিয়ে লিখেন,,
”একটু ভেবে দেখ
এই পৃথিবীর সব মানুষের সবকিছুই এক
দেহ এবং মনের চাওয়া কান্না এবং হাসি
আনন্দ আর বেদনা স্বপ্ন অভিলাষী
কালো এবং সাদা মানুষ হিন্দু মুসলমান
বৌদ্ধ এবং জৈন ইহুদী খৃস্টান
হাড়গোড় মাংসপেশি সবার একি ধরন
জন্ম যেমন তেমনি করে সবার হয় মরন
শত ধর্ম শত বর্নের রক্ত মিশাও একখানে
কে কোন ধর্ম বরন ভাগ হবেনা ব্যবধানে
ধর্ম বর্ণে ব্যবধান নয়, নহে ফারাক দীনধনি
হোক পরিচয় সব মানুষের মানুষ প্রতিধ্বনি”

কবি নিজামীর উক্ত কবিতার লাইনগুলি অত্যন্ত সম্মানজনক এবং সমতাপূর্ণ মন্তব্য। এটিতে প্রকৃতপক্ষে মানুষের একতা সমতা নিয়ে একটি গভীরভাবে বিচার করেছেন। মানুষের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, দেশ বিদেশ, সংস্কৃতি এবং অভিজাত সংস্কারের প্রতি কোনও প্রাধান্য নাই, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্তব্য পাঠককে মানুষের একতা ও সমানতার উপর চিন্তা করতে উৎসাহিত করবে।

কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী বর্তমানের একজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি ও সাহিত্যিক । তার লেখা ও কবিতার মাধ্যমে তিনি সামাজিক সংস্কৃতি ও মানবিক বিষয়ে গভীরভাবে ভাবগুলি প্রকাশ করেছেন। তার রচনা বিষয়ে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার কবিতা ও লেখাগুলিতে সাধারণভাবে ধর্মের প্রতি সম্মান এবং সহগামী ভাবনা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি ধর্মীয় কবিতার পাশাপাশি ধর্মীয় সঙ্গীত লিখে মানুষকে বিভিন্নভাবে ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদানের জন্য উৎসাহিত করেছেন। যেহেতু তিনি একজন মানবিক দার্শনিক, সেহেতু তার কাব্য ও লেখায় সমগ্র মানবতার আদর্শ এবং সম্মান প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার রচনা করা জনপ্রিয় হিন্দু ও বৌদ্ধ সঙ্গীত।

বৌদ্ধ সঙ্গীত:

জনপ্রিয় বৌদ্ধ ধর্ম সংগিত
মাহমুদুল হাসান নিজামী

অহিংস বানী নিয়ে
এলেন ধরা ধামে
জগৎবাসী ছিনলো
তারে গৌতম বুদ্ধ নামে।।২

শুদ্ধ কর আত্মা তব
রুদ্ধ কর পাপের দ্বার
শান্তি সুখের বানী দিলেন
অনন্ত জ্ঞানে তার
বুদ্ধ মানে মহা জ্ঞানী
সত্য জাগান প্রানে
গৌতম বুদ্ধ নামে।।

বিশ্বতরে আনে মুক্তি বানী
জীবহত্যা মহাপাপ বলেন তিনি
বোধি বৃক্ষ যার ধর্মে
পূর্নতা আনে
গৌতম বুদ্ধ নামে ।।

কবি নিজামী র বৌদ্ধ ধর্ম সংগিত এবং হিন্দুধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাব নিচের হিন্দু ধর্ম সংগিতই বহন করে।কোন মহান মানুষ সন্কির্ন চিন্তার হতে পারেন না।কবি নিজামীই তার প্রমান।নিজের ধর্ম ইসলামের বিশ্বাসর অটল থেকেও অন্য ধর্মে সম্মান এক অনন্য দৃস্টান্ত।যেন আরেক নজরুলের প্রতিচ্ছবি।

হিন্দু ধর্ম সংগীত
মাহমুদুল হাসান নিজামী

ব্রম্ম তুমি সাজালে গো
জগতসভা অপরূপা
প্রথম মানব সৃষ্টিলোকে
মহামনু শতরূপা
ব্রম্ম বিষ্ণু শিব মহান
প্রতিমূর্তি দেবতার
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাম বিষ্ণুর দুই অবতার।।

ব্রম্ম করেন সৃষ্টি যত
বিষ্ণু করেন লালন পালন
শিব আনেন ধ্বংস লীলা
ধরনীতে ছারখার
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাম বিষ্ণুর দিই অবতার।।

ব্রম্ম তুমি হরি তুমি
ওগো নারায়ণ
প্রথম সৃষ্টি জলদী
তব আরোহণ
ব্রম্ম বিষ্ণু শিব শত হাজারো নামে
আরতি আরাধনা কোটি দেবতার
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাম বিষ্ণুর দুই অবতার।।

মহাকালী দুর্গা দেবী
তুমি পার্বতী
লক্ষ্মী আনেন লক্ষ্মী যতো
বিদ্যা সরস্বতী
রাধার সঙ্গী শ্রীকৃষ্ণ
রাম সঙ্গী সীতার
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাম বিষ্ণুর দুই অবতার।।

এছাড়া, মাহমুদুল হাসান নিজামী একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন, তার পত্রিকায় তিনি সবসময় ধর্মের প্রতি সম্মান ও মূল্যায়নের জন্য নিরলস ভাবে লিখেন।
একজন সৎ মানুষ হিসেবে, মাহমুদুল হাসান নিজামী সকল ধর্মের প্রতি সম্মান এবং সহগামী ভাবনা প্রকাশ করেন, যা তার রচনা ও মন্তব্যগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন