নিউজ ডেস্ক

বিদেশে মানব পাচার চক্রের খপ্পরে তরুণ, প্রতিনিয়ত হুমকী!

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: শাহাবুদ্দিন ও কৃষ্ণ চক্রের খপ্পরে পড়ে গৌরব সানজারী নামে এক তরুণ আজ সর্বস্ব হারিয়ে পথে পথে। তাকে প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে নির্যাতন করে ৫০ হাজার ডলার দাবী করে। তা দিতে অস্বীকার করায় তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে আমেরিকার নিউ জার্সির বার্লিন শহরে।
আমেরিকায় ঘুরতে গিয়ে শাহাবউদ্দিন মানব পাচারচক্র ও কণিকা মজুমদার তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় গৌরব সানজারি নামে এক তরুণের। জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে আলাপচারিতার সূত্রে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান কণিকা মজুমদারের সাথে। এরপর পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তারা। বিয়ের সময় শর্ত অনুসারে কনেকে ২২ ভরি স্বর্ণের গহনা দেন গৌরবরা। তিনি তখনো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি এক ভয়াবহ প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। টাকা না দেয়ায় গৌরব সানজারীকে যুক্তরাষ্ট্রে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেন ও গৌরবের গ্রীণকার্জ ও সকল গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র মানবপাচার চক্র রেখে দেয়। গৌরব সানজারীকে মামলা তুলে নিতে শাহাব উদ্দিন ও কণিকা মজুমদার চক্রের সদস্যরা অব্যাহত হুমকী প্রদান করে চলেছে বলে জানা যায় এবং মামলা তুলে ফেলারও হুমকী দেয় এবং গৌরবসহ তার পরিবারের সদস্যদেরকে আরো মিথ্যা মামলায় ফাসাবে বলে হুমকী প্রদান করে।
নিউ জার্সির বার্লিন শহরে শাহাব উদ্দিন ও শিল্পী মজুমদার দেহ ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন নরনারীকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করে। অর্থ দিতে অস্বীকার করলে তাদের স্পর্শকাতর জায়গার ছবি তুলে স্যোশাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেবে হুমকী দেয়। এভাবে তারা গৌরবের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শ কাতর জায়গার ছবি তুলে রাখে।
বাংলাদেশে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কনে ফিরে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। কিছুদিন পর চট্টগ্রামের তরুণ গৌরবকেও যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। এরপরই কনেপক্ষের ফাঁদে আটকা পড়েন তিনি। মারধর আর নির্যাতন করে নেওয়া হয় ২০ হাজার ডলার। এরপর আরও দাবি করা হয় এক কোটি টাকা। স্বল্প আয়ে সংসার চলা গৌরবের পরিবার সেই দাবি মেটাতে পারেননি। আর এ কারণেই মাসের পর মাস বদ্ধ কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয় গৌরবের ওপর। এমনকি ওই চক্রের সদস্যরা দেশে থাকা গৌরবের বাবা-মাকেও মেরে আহত করে।

জানা যায়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরতে গিয়েছিলেন গৌরব সানজারি। সেখানে বাঙালি তরুণী পরিচয়ে দেখা হয় কণিকা মজুমদারের সঙ্গে। কথাবার্তা থেকে বিষয়টি প্রেমে গড়ায়। তবে ওই তরুণীর বিরুদ্ধে ছিল বহু অভিযোগ। চুক্তিভিত্তিক বিয়ের নামে বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া চক্রে কাজ করত ওই তরুণী।

জানা যায়, কণিকা মজুমদার যুক্তরাষ্ট্রে নানা নামে পরিচিত। কখনো তার নাম কণিকা, কখনো সীমা, কখনো বা সেঁজুতি। তার পরিবারের সদস্যরাও এমন নানা প্রতারণায় জড়িত। কৃষ্ণ মজুমদার, ব্রাজা মজুমদার ও শাহাবুদ্দিন নামধারী এক ব্যক্তি এই প্রতারক চক্রকে নেতৃত্ব দেয়।

নির্যাতনের শিকার গৌরব সানজারি বলেন, ‘আমেরিকা যাওয়ার পর থেকেই তারা শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন শুরু করে। মারধর করে আমেরিকার ব্যাংক থেকে ৮ হাজার ডলার এবং নগদ প্রায় ৬ হাজার ডলার নিয়ে যায় কণিকা মজুমদার। একপর্যায়ে আরও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর করে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়। এমনকি গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক মিথ্যা মামলায়ও ফাঁসিয়ে দেয় আমাকে।

তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা ঘটলেও দেশে থাকা আমার পরিবার কিছুই জানতে পারেনি। কিন্তু কণিকা মজুমদার চক্রের বাংলাদেশে অবস্থানকারী দালালরা যোগাযোগ করে আমার পরিবারের সঙ্গে। তাদের কাছে টাকা দাবি করে, না হলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এমনকি আমার বয়স্ক বাবা-মাকে মারধর করে। ওই চক্রের মারধর এবং অত্যাচারে গুরুতর আহত হন তারা। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।’

গৌরব অভিযোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে নির্যাতনের সময় সঞ্জীব মজুমদার ও সুমন মজুমদার আমাকে বলত টাকা না দিয়ে এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। এটা আমাদের ব্যবসা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে আমাকে যাতে ফাঁসানো যায়, এ জন্য দেশে থাকা ওই প্রতারক চক্রের সদস্যরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করে, যাতে দেখানো যায় আমি দেশেও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।’

গৌরব বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে এদের নামে অভিযোগ দিয়েছি। হোয়াইট হাউস, আমেরিকান ন্যাশনাল ভিসা সেন্টার, ইউএসসিআইএস, আমেরিকান কোর্ট, বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করি। আর এক্ষেত্রে সব ধরনের প্রমাণও মেইল করে পাঠাই।’

তিনি আরও জানান, ‘শুধু চুক্তিভিত্তিক বিয়ের নামে প্রতারণা নয়, এই চক্রটি শিশুদের দিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করে। এমনকি আমাকেও যৌন নির্যাতন করে। জ্ঞান হারানো পর্যন্ত নির্যাতন করত। এ-সংক্রান্ত অনেক তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এই চক্র বিয়ের নামে প্রতারণা করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ভুয়া ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট এবং ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে।’

জানা গেছে, সংঘবদ্ধ এই চক্রের বাংলাদেশেও একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার প্রলোভনে ফেলে। এরপর কৌশলে সে দেশে নিয়ে আটকে রেখে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠাতে বাধ্য করে। টাকা দিতে অপারগতা জানালে চলে নির্যাতন। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এভাবে লোকজনকে প্রলোভনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

গৌরব সানজারি বলেন, ‘অনেক কষ্টে দেশে ফিরলেও এখনো অতীত ভুলতে পারছি না। এখানেও আমাকে মারার জন্য ওই সিন্ডিকেটের লোকজন খুঁজছে। বেশ কয়েকবার হামলার চেষ্টাও করেছে। দুটি মোবাইল নম্বর থেকে প্রতিনিয়ত দেওয়া হচ্ছে হুমকি-ধমকি। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গৌরব সানজারিকে হুমকি দেওয়া নম্বর দুটিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে।

মন্তব্য করুন