“আঁই চাই আঁরার গল্প ছবির মাইধ্যমে তুলি ধরিবার লাই। যেন নেকি গোডা দুইন্না জানিত তারে আঁরা কেন গরি বাঁচি।” (“আমি চাই ছবিতে আমাদের জীবনটা দেখাতে। যেন সারা বিশ্ব জানে আমরা কেমন করে বাঁচি।)” কথাগুলো বলছিলেন কুতুপালংয়ের ওয়ান ইস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হেমায়েত উল্লাহ। তাঁর হাতে ছিল মোবাইল ফোন, আর চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন। এই স্বপ্ন নিজের তোলা ছবির মাধ্যমে নিজের কমিউনিটিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার। হেমায়েতের মতো ত্রিশ স্বপ্নবাজ তরুণকে নিয়ে বুধবার আয়োজন করা হয়েছিল ‘ছবির ফ্রেমে জীবনের গল্প’ শিরোনামের একটি সংলাপের। শুধু রোহিঙ্গা কমিউনিটির নয়, বাংলাদেশী তরুণরাও অংশ নিয়েছিল এই আয়োজনে। সংলাপে উপস্থিত ছিলেন দুই কমিউনিটির ৩০ জন তরুণ। এই সংলাপের আয়োজন করে ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)। এতে সহযোগিতা করে ডয়েচে ভেলে একাডেমি।
বুধবার সকাল ১১টায় কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প ওয়ান ইস্টের বি ব্লকে শুরু হয় সংলাপ। মোহাম্মদ ইব্রাহীম ও ইয়াসমিন আক্তারের সঞ্চালনায় এই সংলাপে অংশ নেন প্রথম আলোর নিজস্ব আলোকচিত্রী জুয়েল শীল ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা আলোকচিত্রী আবদুল্লাহ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও কাজের উদাহরণ তরুণ অংশগ্রহণকারীদের অনুপ্রাণিত করে। ছবির ভেতর দিয়ে জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর আশার কথা তাঁরা তুলে ধরেন আলোচনায়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জুয়েল শীল বলেন, 'শরণার্থী শিবিরের সরু গলি, অস্থায়ী ঘর আর ভিড়ভাট্টার ভেতরেও লুকিয়ে আছে অসংখ্য গল্প। সেই গল্পগুলোকে বলা যায় না শুধু শব্দে, বরং ছবির মাধ্যমে ধরা যায় আরও গভীরভাবে। ছবির শক্তি শব্দের মতোই প্রভাব ফেলে। একটি ছবি অনেক সময় পুরো একটি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।” আলাপচারিতায় জুয়েল শীল আরও বলেন, “ছবি কখনো একটা মানুষকে কাঁদাতে পারে, কখনো আবার দাঁড় করিয়ে দেয় প্রতিবাদের মঞ্চে।” তরুণদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ—ক্যামেরা দিয়ে শুধু সৌন্দর্য নয়, সমাজের সত্যিটাও তুলে ধরতে হবে।
আলোকচিত্রী আবদুল্লাহ'র অভিজ্ঞতা যেন তরুণদের আরও ছুঁয়ে গেল। তিনি জানালেন, “আমি নিজেই শরণার্থী। নিজের কষ্টই যখন ছবি দিয়ে বলি, তখন বাইরের মানুষের কাছে সেটা হয়ে ওঠে বাস্তবতার সাক্ষ্য।” তাঁর কথায় তরুণদের চোখেমুখে ভেসে উঠল নতুন এক উপলব্ধি—ছবি শুধু শিল্প নয়, পরিবর্তনের হাতিয়ারও হতে পারে। আলোচনার পাশাপাশি দুই আলোকচিত্রশিল্পী ছবি তোলার বেশকিছু মৌলিক দিকনির্দেশনা দেন তরুণদের।
সংলাপজুড়ে তরুণরাও বললেন তাঁদের ভাবনার কথা। কেউ বললেন, ছবি তুলে নিজেদের গল্প ছড়িয়ে দিতে চান বিশ্বজুড়ে, কেউ আবার স্বপ্ন দেখলেন আলোকচিত্রী হয়ে সমাজের ভেতরের কষ্ট আর লুকানো সৌন্দর্যকে তুলে ধরবেন। সংলাপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশী তরুণ হামিদ হোসাইন জানান, তিনি ছবি তোলার কৌশল শেখার পাশাপাশি বুঝতে পেরেছেন—একটি ছবির ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষের জীবনসংগ্রাম ও আত্মকথন। রোহিঙ্গা যুবক নুর বশর জানালেন এই ধরণের আয়োজনের অংশ নিতে পেরে তাঁর ভালো লাগার কথা। বললেন ভবিষ্যতে এই ধরণের আয়োজনগুলো তাঁদের হতাশা দূর করতে বেশ সহযোগিতা করবে।
আয়োজন প্রসঙ্গে কমিউনিটি কমিউনিকেশন স্কীলস ডেভেলপমেন্ট ফর সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস ইন কক্সবাজার প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শিহাব জিশান বলেন, “আমাদের প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো তরুণদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেওয়া, যেখানে তারা তাদের জীবন, সংগ্রাম ও আশা-আকাঙ্ক্ষা নিজেরাই তুলে ধরতে পারে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় তরুণদের নিয়ে এই আয়োজন আমাদের দেখিয়েছে যে তারা শুধুমাত্র দর্শক নয়, বরং পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হতে চায়। ছবি সেই সুযোগ তৈরি করে—এটি ভাষার সীমা ছাড়িয়ে সবার হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আমাদের জীবনের গল্পগুলো ছবির ফ্রেমে বন্দী হয়ে এক অনন্ত ভাষা সৃষ্টি করে। এই ভাষা শুধু শিল্প নয়, বরং সমাজে পরিবর্তন ও আশার হাতিয়ার। তরুণদের সৃজনশীলতা বিকাশ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে আমরা নিয়মিত এমন আয়োজন চালিয়ে যেতে চাই।”