নিউজগার্ডেন ডেস্ক: সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপকে তৈরি পোশাক শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য ‘মারাত্মক বিপর্যয়কর’ ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের ত্রিমুখী চাপে থাকা পোশাক শিল্পকে কোণঠাসা করার মতো সময়ে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও আত্মবিধ্বংসী।
তিনি বলেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে নিট পোশাক খাত এককভাবে ৫৫ শতাংশ বা প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে। এই খাতের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ। সেই সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ মানেই সরাসরি রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান অভিযোগ করেন, ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই পোশাক শিল্পের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘সেফগার্ড চুক্তি’র সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোনো স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়াই স্থানীয় শিল্পে ‘সিরিয়াস ইনজুরি’র অজুহাতে এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে প্রতি কেজি ‘৩০ কার্ডেড’ সুতার দাম ২.৫০ থেকে ২.৬০ ডলার, সেখানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো একই সুতা ৩ ডলারে সরবরাহ করতে চাইছে। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ৪০ সেন্ট অতিরিক্ত খরচ পড়ে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা পোশাক শিল্পের জন্য অসম্ভব।
সেলিম রহমান বলেন, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর অদক্ষতা ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয় আড়াল করতে গিয়ে কৃত্রিম সুরক্ষার মাধ্যমে একচেটিয়া বাজার তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ এসব মিল এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত সুতা সরবরাহে সক্ষম নয়।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ কমেছে, আর শুধু ডিসেম্বরেই কমেছে ১৪.২৩ শতাংশ। এর ওপর সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ হলে ক্রয়াদেশ আরও কমবে এবং পুরো রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সেলিম রহমান বলেন, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। স্পিনিং মিলগুলোকে রক্ষা করতে হলে শুল্ক নয়, বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ, কর ছাড় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজিএমইএ'র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা হলে তৈরি পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ হলে তা নিঃসন্দেহে রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো রক্ষা করার পক্ষে, তবে এই মুহুর্তে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে সেটি তৈরি পোশাক শিল্পে বড়ো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে গত ছয় মাস ধরে আমাদের রপ্তানি নিম্নমুখী রয়েছে। সুতায় বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার হলে রপ্তানি আরো বড়ো ধরনের হোঁচট খাবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি(অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি রেজওয়ান সেলিম, শিহাব উদদৌজা চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম, মোহাম্মদ আবদুর রহিম (ফিরোজ), ফয়সাল সামাদ বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রমুখ।