এম. নুরুল হুদা চৌধুরী: আমাদের আনোয়ারা উপজেলার এখন ঐতিহ্যবাহী নদী চামুদরিয়া। এই প্রাচীন চামুদরিয়া এক সময় বঙ্গোপসাগরে আদি প্রাচীন নাম ছিলো। চামুদরিয়া বন্দরের অস্থিরত্ব আজো আনোয়ারা চন্দনাইশের শঙ্খনদীর মোহনা কেন্দ্রে গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের স্মৃতিতে চামুদরিয়া খুবই বিখ্যাত ও প্রাচীনত্বের চিহ্ন। গৌরবকুলের প্রতীক চামুদরিয়া ঘাটকুলে একটি সেতু নির্মান আজ সময়ের দাবী।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনজীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী চাঁনখালী নদী। পটিয়া উপজেলা, আনোয়ারা উপজেলা ও চন্দনাইশ উপজেলার এই তিন উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত এই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, জীবিকার উৎস এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতির অংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বসতি, বাণিজ্য, কৃষি এবং সামাজিক সম্পর্কের এক অনন্য জাল। কিন্তু আধুনিকতার যুগে এসে এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এখনও কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই চামুদরিয়া ঘাটকুল মোহনায় একটি আধুনিক ‘ওয়াই-টাইপ’ সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি এবং জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
নদী ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ—এই সত্য নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, বাংলার ইতিহাস মূলত নদীর ইতিহাস। সেই ধারাবাহিকতায় চাঁনখালী নদী দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জীবনপ্রবাহের অন্যতম ভিত্তি। কর্ণফুলী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে শঙ্খ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত এই নদী এক সময় ছিল অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগপথ।
একসময় লঞ্চ, সাম্পান ও নৌকাই ছিল মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম। চাক্তাই ঘাট থেকে বাঁশখালীর চাম্বল পর্যন্ত চলাচলকারী লঞ্চ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখত। নদীর দুই তীর জুড়ে ছিল বাজার, মেলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য। চামুদরিয়া ঘাটকুল ছিল ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত একটি বাণিজ্যকেন্দ্র, যা আজ প্রায় হারিয়ে গেছে সময়ের প্রবাহে।
ঐতিহ্য থেকে অবহেলায়: নব্বইয়ের দশকের পর সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটলেও চাঁনখালী নদীর গুরুত্ব ক্রমশ কমতে থাকে। নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে যায়। যদিও ১৯৯৪ সালে বরকল এলাকায় একটি বেলি ব্রিজ নির্মাণ কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়, তবুও তা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে সম্পূর্ণ অপ্রতুল।
আজও এই অঞ্চলের লাখো মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে পারাপার হতে হয়, বিশেষ করে বর্ষাকালে যা জীবননাশের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে শহরে যাতায়াতে সময় ও ভোগান্তি উভয়ই বৃদ্ধি পায়।।
কেন প্রয়োজন ‘ওয়াই-টাইপ’ সেতু?: চামুদরিয়া ঘাটকুল মোহনায় একটি ‘ওয়াই-টাইপ’ সেতু নির্মাণ শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এই সেতুর মাধ্যমে তিনটি উপজেলা—পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশ—সরাসরি সংযুক্ত হবে। একটি সাধারণ সরল সেতুর পরিবর্তে ‘ওয়াই-টাইপ’ সেতু নির্মাণের ফলে তিনটি দিকেই সমানভাবে যোগাযোগ সুবিধা সৃষ্টি হবে, যা এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন: এই সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। আনোয়ারার ইকোনমিক জোন, পটিয়ার বিসিক শিল্প এলাকা এবং বাঁশখালীর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। ফলে কৃষিপণ্য ও শিল্পসামগ্রী সহজেই চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছানো যাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।
এছাড়া নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পর্যটনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। চাঁনখালী নদীর ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে একটি নতুন পর্যটন কেন্দ্র।।
সামাজিক ও মানবিক প্রভাব: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু অর্থনীতিকেই নয়, মানুষের জীবনমানকেও পরিবর্তন করে। একটি সেতু নির্মাণের ফলে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত সহজ হবে, রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাওয়া সম্ভব হবে এবং সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। বর্তমানে যেখানে একটি পথ অতিক্রম করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে সেতু নির্মিত হলে তা নেমে আসবে কয়েক মিনিটে। এটি শুধু সময় সাশ্রয়ই করবে না, বরং মানুষের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আধুনিকতার সমন্বয়: চাঁনখালী নদী শুধু একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক বন্ধন আজও মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত। তাই সেতু নির্মাণের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা রক্ষা, নৌপথ পুনরুজ্জীবন এবং পরিবেশ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে চাঁনখালী তেরমুজখালী নদী সংরক্ষণ কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে, যা একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।
জনদাবি থেকে বাস্তবায়ন: সম্প্রতি চট্টগ্রাম একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সভায় তিন উপজেলার শতাধিক সচেতন নাগরিক এই সেতু নির্মাণের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। আনোয়ার ফাউন্ডেশন জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই সেতু এখন আর কেবল একটি প্রস্তাব নয়; এটি একটি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা একযোগে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করেন, তবে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
প্রস্তাবনা: পটিয়া কর্ণফুলী-শিকলবাহা কর্ণফুলী নদীর মূখ থেকে বঙ্গোপসাগরে মোহনা বাশঁখালী প্রেমাশিয়া বাংলাবাজার মূখ পর্যন্ত উক্ত খালে দুই পাড় ড্রেনেস সিস্টেম চালু করন, নদী খনন করন, নদীর ভুমি রক্ষা করন, দুই পাশে আধুনিক ঢালাই যুক্ত পাকা দেয়াল নির্মান কে পানি চলাচল, পানি সংরক্ষণ, নদীতে নৌ যন্ত্র দিয়ে বিনোদন উপযোগী করে এই নদীকে সম্পদে পরিনত করতে হবে।।
শেষ কথা: চামুদরিয়া ঘাটকুল মোহনায় একটি ‘ওয়াই-টাইপ’ সেতু নির্মাণ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। এটি শুধু তিনটি উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই উন্নত করবে না, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
অতএব, জনস্বার্থে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি—অতি দ্রুত এই প্রকল্পের সমীক্ষা সম্পন্ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। চাঁনখালী নদীর ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাক দক্ষিণ চট্টগ্রাম—এই প্রত্যাশাই আজ সর্বস্তরের মানুষের।
লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চা পরিষদ, সহ সভাপতি, মুসলমান ইতিহাস সমিতি, বাংলাদেশ, সাধারণ সম্পাদক, আনোয়ারা ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম।