নিউজগার্ডেন ডেস্ক: প্রতিবছর ঈদ এলেই দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শুরু হয় শ্রমিক অসন্তোষ, বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও অনিশ্চয়তা। তবে এবার চট্টগ্রামে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। ঈদের আগে শ্রমিকদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে যেন নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সমন্বিত উদ্যোগে এবার চট্টগ্রামের শতভাগ গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল চট্টগ্রামে এবার ঈদের আগে বিরাজ করছে স্বস্তির পরিবেশ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে ঈদের আগেই শতভাগ পোশাক কারখানায় বেতন ও বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, এবার চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত বেতন ও বোনাস নিশ্চিতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১১টি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোতেই ইতোমধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকরা কাজ করবে, আর তাদের ঘাম শুকানোর আগেই বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে হবে। এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। মালিকপক্ষের কোনো সহায়তা প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করেছে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঈদকে সামনে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিবিড় নজরদারি চালানো হয়। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে নিয়মিত বৈঠক, শ্রমিক-মালিক সমন্বয় সভা, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত এবং মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের কারণে এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও এ কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, গুজব প্রতিরোধ এবং সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় তারা সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলে জানা গেছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের শতভাগ পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সমন্বিত ও মানবিক উদ্যোগ শ্রমজীবী মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। শ্রমিকবান্ধব এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের জন্যও অনুসরণীয় মডেল হতে পারে।
গত ঈদুল ফিতরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়ার নির্দেশে একটি তৈরি পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার ‘জেপি সনেট লিমিটেড’ নামের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে গত ১৮ মার্চ এ উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ শামসুল আজম বলেন, “জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম প্রথম থেকেই বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করেছেন। এছাড়া এবার আমরা আমাদের সব সদস্যকে ঈদের আগে বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্য বিশেষ অনুরোধ করেছিলাম। ফলে চট্টগ্রামের নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকরা শ্রমিকদের সব বকেয়া পরিশোধ করতে পেরেছেন।”
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, “চট্টগ্রামের প্রতিটি শিল্পখাতের, বিশেষ করে গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করেছেন মালিকরা। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম স্যার আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনি নিজে কারখানার মালিকদের ফোন করে বেতন দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। এছাড়া আমাদের অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও মালিকপক্ষকে অনেক আগে থেকেই কাউন্সেলিং করা হচ্ছিল। ফলে আমরা চট্টগ্রামে শতভাগ শ্রমিকের বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করতে পেরেছি।”
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালনা পর্ষদের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. শরীফ উল্লাহ এ সফলতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “আসলে এবার সরকারেরও শতভাগ সদিচ্ছা ছিল। পোশাক রপ্তানি খাতে যেসব ইনসেনটিভ ছিল, সেগুলো সরকার ছাড় দিয়েছে। আমরা বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের হয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি।”
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে একজন মানবিক ডিসি হিসেবে আখ্যায়িত করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “চট্টগ্রামের এ সফলতার জন্য চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর একযোগে কাজ করেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতি ঈদেই সারা দেশে এমন সফলতা সম্ভব হবে।”