সৈয়দ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম: চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি কালুরঘাটে একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ। প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কালুরঘাট রেলসেতু আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ১৯৩০ সালে নির্মিত এই সেতু ৯৬ বছর ধরে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরকে সংযুক্ত করে আসছে। তবে সময়ের সাথে সাথে সেতুটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং বহু বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে।
বোয়ালখালী, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া ও বান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম ভরসা এই সেতু। ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি সড়কযানও ব্যবহার করছে একই সেতু, যা দীর্ঘদিন ধরে জনদুর্ভোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বহু আগেই সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, এমনকি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বও একাধিকবার এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ফলে স্থানীয় মানুষের মনে বারবার প্রশ্ন জেগেছে—এ কি শুধুই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, নাকি সত্যিই একদিন বাস্তবে রূপ নেবে?
কালুরঘাট সেতুর গুরুত্ব শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও অপরিসীম। বর্তমান সেতুটি একমুখী হওয়ায় যানজট প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। ট্রেন চলাচলের সময় উভয় প্রান্ত বন্ধ রাখতে হয়, যার ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। যে দূরত্ব ২০ মিনিটে অতিক্রম করার কথা, তা অনেক সময় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের ঐতিহাসিক সেতুগুলোকে যুগোপযোগী করে সংরক্ষণ করেছে। ইংল্যান্ডের লন্ডন ব্রিজ, ভারতের হাওড়া ব্রিজ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার ব্রিজ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। অথচ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সেতু কালুরঘাট সেতু দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে।
অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর নতুন কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রায় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই সেতু হবে চার লেনবিশিষ্ট। একপাশ দিয়ে চলবে রেললাইন, অন্যপাশ দিয়ে চলবে বাস, ট্রাকসহ সাধারণ যানবাহন। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭০০ মিটার এবং এটি কর্ণফুলী নদীর দুই তীরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে টেন্ডার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। যদিও দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও সীমিত, তবুও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে।
বর্তমান সরকার নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটি শুধু একটি সেতু নয়; দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন, আশা এবং উন্নয়নের প্রতীক। সেতুটি নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে, শিল্প-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পাবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন মানুষের প্রত্যাশা একটাই—আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন। কালুরঘাটের মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, এবার তাদের স্বপ্নের সেতু বাস্তবেই দৃশ্যমান হবে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে দেবে।