নিউজগার্ডেন ডেস্ক: সকাল থেকেই আকাশ কালো। একটানা বৃষ্টি। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে কাদা আর ঢলের পানি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টি আরও কয়েক দিন চলতে পারে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে চট্টগ্রামের হাজারো পরিবারের।
এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ হতে পারত কার্যালয়ে বসে জরুরি বৈঠক করা কিংবা নির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বেছে নিলেন ভিন্ন পথ। তিনি নিজেই নেমে গেলেন পাহাড়ের পাদদেশে, মানুষের মাঝে।
মঙ্গলবার দুপুরে আকবর শাহ সংলগ্ন ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন তিনি। কাদা, বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে সরেজমিন পরিদর্শন করেন ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল, বিজয়নগর এবং শান্তিবাগ (পানির ট্যাংক এলাকা)। পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। জানতে চান তাদের ভয়, প্রয়োজন ও প্রস্তুতির কথা। মাঠে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন।
পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনের পর জেলা প্রশাসক পৌঁছান ১ নম্বর ঝিলসংলগ্ন ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।
সেখানে আশ্রয় নেওয়া নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে মেঝেতে দাড়িয়েই কথা বলেন তিনি। হাতে মেগাফোন নিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করেন—সরকার তাদের পাশে রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যেন তারা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে ফিরে না যান।
আশ্রয়কেন্দ্রে উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন,
"আমরা সবাই এসেছি, যাতে আপনাদের মধ্যে কোনো ধরনের ভয় বা সংকোচ কাজ না করে। সরকার একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। সরকার আপনাদের পাশে আছে। আমরা আপনাদের জন্য এখানে এসেছি। আপনারা নিরাপদে থাকবেন। কারও কোনো বিশেষ প্রয়োজন হলে আমাদের জানাবেন। আমরা সেটি দেখব।"
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসিল্যান্ড এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
"তারা যখন আপনাদের কোনো কিছু বলবেন বা অনুরোধ করবেন, দয়া করে তা শুনবেন। কারণ, প্রশাসনের কথা না শুনলে আপনারাই নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন।"
শুধু বক্তব্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি জেলা প্রশাসক। তিনি আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর হাতে নিজেই শুকনা খাবারের প্যাকেট তুলে দেন। শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি ও প্রবীণদের খোঁজ নেন। সঙ্গে থাকা সিভিল সার্জনকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিটি পরিবারের জন্য মিনারেল ওয়াটারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, "আজ এখানে যারা এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের হাতে শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে মিনারেল ওয়াটারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আগে জীবন, তারপর অন্য সবকিছু। জীবন না থাকলে অন্য কিছুর কোনো মূল্য নেই।"
তিনি জানান, আগের রাতে প্রায় ২৫ থেকে ২৬টি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার পরও তারা আবার নিজেদের ঘরে ফিরে গিয়েছিল।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পাহাড়ধসের বড় দুর্ঘটনাগুলো সাধারণত গভীর রাতে ঘটে।
"মানুষ তখন ঘুমিয়ে থাকে। বের হওয়ার সুযোগও পায় না। তাই কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরে যাবেন না।"
তবে মানুষের সম্পদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে প্রশাসন।
তিনি বলেন, কেউ যদি নিজের ঘরবাড়ি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দলগতভাবে গিয়ে দেখে আসার ব্যবস্থাও করা হবে।
মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারির পর থেকেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে। তাদের নিরাপত্তায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করছে। প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মাঠে কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় গত সোমবার রাত থেকেই আকবর শাহর ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল, বিজয়নগর, শান্তিবাগ (পানির ট্যাংক এলাকা), বেলতলীঘোনা, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক এলাকা, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশন-সংলগ্ন পাহাড়, মতিঝর্ণা, পোড়া কলোনি, ঢেবারপাড়, আমবাগান ও উত্তর হালিশহরসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
পাহাড়সংলগ্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বর্তমানে ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১১০ জন, ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুলে ৪০ জন, ইলমুল কোরআন মাদ্রাসায় ৫০ জন এবং আল হেরা মাদ্রাসায় ১৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক পরিবার আবার আত্মীয়স্বজনের বাসায় নিরাপদে অবস্থান করছেন।
০১ নম্বর ঝিল এলাকা সমাজ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন,
"ডিসি স্যারের পরিদর্শনের সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। তিনি যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে ছিন্নমূল ও সাধারণ মানুষের কথা শুনেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। মনে হয়নি তিনি শুধু একজন জেলা প্রশাসক। মনে হয়েছে, জেলার একজন অভিভাবক মানুষের খোঁজ নিতে এসেছেন। পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় তাঁর প্রতিটি কথায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে।"
পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ছিন্নমূল মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, শহরের মধ্যে পর্যাপ্ত সরকারি খাসজমি নেই। শহরের বাইরে আবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও কর্মসংস্থান, সন্তানদের পড়াশোনা ও যাতায়াতের কারণে অনেক পরিবার সেখানে যেতে চান না।
তবে তিনি বলেন, কেউ যদি স্বেচ্ছায় পুনর্বাসনে যেতে চান এবং আবেদন করেন, তাহলে সরকারি খাসজমি পাওয়া সাপেক্ষে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
চট্টগ্রামে অতীতের পাহাড়ধসের ইতিহাস ভয়াবহ। অসংখ্য প্রাণহানি, বিধ্বস্ত পরিবার আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার চট্টগ্রাম প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার জন্য অপেক্ষা করেনি; বরং আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি জেলা প্রশাসনের সরাসরি মাঠে উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঝড়-বৃষ্টি আর কাদা মাড়িয়ে পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি মানবিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি—যেখানে দুর্যোগের সময়ে রাষ্ট্রের উপস্থিতি শুধু কাগজে-কলমে নয়, মানুষের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকাশ পায়। এমন উপস্থিতিই বিপদের সময় মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করে, আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, মানবিক দায়িত্বেও পরিণত করে।