চট্টগ্রাম, ১২ জুলাই: বৃহত্তর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) অঞ্চলে চলমান ভয়াবহ বন্যা, পাহাড়ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় অবিলম্বে এলাকাটিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা টিম গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর ও বিশিষ্ট পরিবেশবিদ মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
আজ রবিবার (১২ জুলাই) এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, টানা কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি, পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে খাল-নদী-নালা দখল, পাহাড় কাটা এবং মাটি-বালু উত্তোলনের অবাধ প্রতিযোগিতার ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং দুর্যোগজনিত বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৪৩ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি, অসংখ্য মানুষ গৃহহীন এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। তাই এ সংকটকে শুধুমাত্র আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ২০২৬ সালের ৬ জুলাই চট্টগ্রামে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ছিল ৪১১ মিলিমিটার। কিন্তু ২০২৬ সালের ৬ জুলাই সেই রেকর্ড ভেঙে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪১২.৩ মিলিমিটার। এই নজিরবিহীন বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডই বন্যাকবলিত হয়েছে এবং নগরীর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছিল। সে সময় বন্দরের ১০০ টনের ‘শক্তিমান’ ক্রেন উপড়ে গিয়ে কর্ণফুলী নদীর সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে এবং সেতুটি দুই টুকরো হয়ে যায়। বর্তমান দুর্যোগের ব্যাপকতাও সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিবৃতিতে তিনি অবিলম্বে বৃহত্তর চট্টগ্রামকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা, সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা টিম গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ, পাহাড় কাটা, খাল-নদী-নালা দখল এবং অবৈধ ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
তিনি দেশের সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিত্তবান নাগরিকদের দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে নিহতদের মাগফিরাত কামনা, আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।