চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও র্যালি-পূর্ব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরের জামিয়াতুল ফালাহ মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এমপি, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এমপি এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং স্বৈরাচারবিরোধী ধারাবাহিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্বাভাবিক পরিণতি। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, গণতান্ত্রিক সংকট ও মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ছিলেন। আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং দেশবাসীকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এই অর্জনকে অর্থবহ করতে হলে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও বেগবান করতে হবে। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত র্যালিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এমপি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল ছাত্র-জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, ভোটাধিকার হরণ, দমন-পীড়ন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল।
তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন, কারাবরণ, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। এই দীর্ঘ আন্দোলনই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জন্য একটি শক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কারও অবদান খাটো না করে প্রত্যেকের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। ৫ আগস্টের বিজয় সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের অর্জন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাঈদ আল নোমান এমপি বলেন, বিএনপির একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি রয়েছে এবং সেই ভিত্তিই জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই ৫ আগস্টের বিজয় সম্ভব হয়েছিল।
তিনি বলেন, সেদিন সরকারের দমন-পীড়ন ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছেই স্বৈরাচারের পতন ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জাতীয় ঐক্য অটুট থাকলে কোনো অন্যায় কিংবা স্বৈরাচার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন,প্রত্যেকটি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সমর্থন ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমার আপনার সকলের দায়িত্ব। যারা শহীদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন এবং যারা বছরের পর বছর গুম, খুন, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই দেশের মানুষ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দেশের মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই বিজয় অর্জিত হয়েছে।যদি এই আন্দোলন ব্যর্থ হতো তাহলে ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের অনেকের ফাঁসি দিয়ে দিত। অনেক নেতাকর্মীদের গুম ও ক্রস ফাইয়ারের শিকার হতে হতো। কিন্তু ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারে না।
এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ আজিজ, অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার, সৈয়দ আজম উদ্দিন, কাজী বেলাল উদ্দিন, শফিকুর রহমান স্বপন, হারুন জামান, শাহ আলম, আর ইউ চৌধুরী শাহীন, শওকত আজম খাজা, ইয়াসিন চৌধুরী লিটন, আহমেদুল আলম চৌধুরী (রাসেল), শিহাব উদ্দিন মুবিন, মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু, সদস্য ইকবাল চৌধুরী, আবুল হাসেম, ইস্কান্দর মির্জা, জাহাঙ্গীর আলম দুলাল, মুজিবুল হক, মো. মহসিন, খোরশেদ আলম, কামরুল ইসলাম, সৈয়দ শিহাব উদ্দিন আলম, আনোয়ার হোসেন লিপু, মোশারফ হোসেন দীপ্তি, মোহাম্মদ জাফর আহমেদ, এ কে খান, গাজী আইয়ুব, মাহবুব রানা, এম এ সবুর, নুর উদ্দিন হোসেন নুরু, মো. আবু মুসা, মো. আজম, মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউসুফসহ মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও শ্রমিকদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দল, তাঁতি দলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সমাবেশে অংশ নেন।
সমাবেশ শেষে জামিয়াতুল ফালাহ মাঠ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জিইসি মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। র্যালিতে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন।