নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে সারের সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে যখন খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে, তখন বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে যাচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তি। কৃষকের উৎপাদন ও পরিচালনা খরচ কমানো, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং সারের পেছনে সরকারের বিপুল ভর্তুকির বোঝা থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসার বিকল্প হিসেবে ন্যানো ফার্টিলাইজার (ন্যানো সার) এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ন্যানো ফার্টিলাইজার (ন্যানো সার) ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি মাটির উর্বরতা রক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে ন্যানো সারের প্রয়োগ বৃদ্ধি, গবেষণা জোরদারকরণ এবং তা মাঠ পর্যায়ে দ্রুত প্রবর্তনের জন্য তাগিদ ও নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় ন্যানো ফার্টিলাইজার বিশ্লেষণ, গবেষণা ও নীতি নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ইতিমধ্যেই ন্যানো সার নিয়ে পাইলট প্রজেক্টের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ন্যানো সারের কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্বরান্বিত করতে একটি বিশেষ ‘ন্যানো সেল’ গঠন করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যানো প্রযুক্তির সাফল্য ও বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ
আন্তর্জাতিক কৃষি খাতে গত ৫-৭ বছর ধরে ন্যানো প্রযুক্তির ফার্টিলাইজার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো সার প্রবর্তন ও প্রয়োগ শুরু করেছে:
দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা: পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো বড় কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে ন্যানো সার সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আফ্রিকা মহাদেশ: সেনেগাল, কেনিয়া এবং উগান্ডার মতো আফ্রিকান দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও কম খরচে ফসল উৎপাদনে ন্যানো সার ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
ইউরোপ: প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক কৃষির অংশ হিসেবে ইউরোপের ইতালি, স্পেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো পরিবেশবান্ধব কৃষি নীতি বাস্তবায়নে ন্যানো সারের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: আমাদের নিকটবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইনে ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি এবং ন্যানো এনপিকে-এর বিস্তৃত ব্যবহার চলছে।
মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব দেশে ন্যানো সার ব্যবহারের ফলে ফসলের ফলন (ণরবষফ চৎড়ফঁপঃরড়হ) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা পেয়েছে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমে এসেছে।
বাংলাদেশে ন্যানো সারের মাঠ পর্যায়ের গবেষণা ও বাংলা মার্কের ভূমিকা
বাংলাদেশে ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা মার্ক কেমিক্যাল লিমিটেড গত পাঁচ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি এবং ন্যানো এনপিকে নিয়ে ব্যাপক পাইলট প্রজেক্ট ও গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। ধান, গম, শাকসবজি এবং আমসহ নানা ধরনের ফলের ওপর পরিচালিত এসব ট্রায়ালে কৃষকদের কাছ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।
পাশাপাশি, দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক টেস্ট ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা কৃষি বিজ্ঞানীরা বাংলা মার্কের ‘ইফকো ন্যানো ইউরিয়া’ এবং ‘এন ব্লু’ (ঘ ইষঁব) সারের ওপর গবেষণা করে সফল রিপোর্ট প্রদান করেছেন, যা বিভিন্ন জার্নাল ও গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা মার্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের নীতিগত সহযোগিতা এবং কমার্শিয়াল অনুমোদন পেলেই তারা দ্রুততম সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বাজারজাতকরণ শুরু করতে প্রস্তুত।
সারের বিশাল ভর্তুকি কাটিয়ে ওঠার স্থায়ী পথ
বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ টন রাসায়নিক সার আমদানিতে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে হয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র ১০ লাখ টন; বাকি ১৬ লাখ টন আমদানি করতে হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী এই সার ক্রয়ে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয় এবং কৃষককে কম দামে সার যোগান দিতে সরকারকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হয়।
৫০০ মিলিলিটারের মাত্র একটি ন্যানো ইউরিয়ার বোতল ৫০ কেজির এক বস্তা দানাদার সারের কাজ করে, যার খরচ কৃষকের জন্য অর্ধেকেরও কম।
বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো সার ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে আমদানিনির্ভরতা কমার সাথে সাথে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৮৭% পর্যন্ত কমানো সম্ভব, যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদী ভর্তুকি নির্ভরতা থেকে বের করে আনবে।
কৃষকের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ হ্রাস
ভারী দানাদার সারের বস্তা পরিবহন, সংরক্ষণ এবং জমিতে ছিটানোর প্রক্রিয়ায় কৃষকের প্রচুর যাতায়াত ও শ্রম ব্যয় হয়। ন্যানো সার তরল হওয়ায় এটি পরিবহন করা অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী। এতে কৃষকের লজিস্টিক, অপারেটিং ও লেবার কস্ট বহুলাংশে কমে আসবে এবং সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমে তাদের নিট মুনাফা নিশ্চিত হবে।
রাসায়নিক সারের বিষাক্ততা থেকে মাটি ও জলাশয় রক্ষা
বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব নষ্ট হচ্ছে এবং উর্বরতা কমছে। এছাড়া ইউরিয়া মিশে জলাশয়ের পানি দূষিত হয়ে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করছে এবং অক্সিজেন গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। বিপরীতে, ন্যানো সারের কার্যকারিতা প্রায় ৯০% হওয়ায় এটি সরাসরি উদ্ভিদের পাতায় শোষিত হয় এবং মাটি ও পানির দূষণ রোধ করে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বৈপ্লবিক সমাধান
দেশে বর্তমানে গ্যাস সংকট এবং আর্থিক কারণে সার কারখানা বন্ধ কিংবা আমদানিতে বাধার ফলে যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, ন্যানো ফার্টিলাইজার তার সময়োপযোগী সমাধান দিতে পারে। সারের অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে, কার্বন নির্গমন কমানোসহ কৃষকের উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে ন্যানো সার বাজারজাতকরণ এখন সময়ের দাবি।