নিউজগর্ডেন ডেস্ক: ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, একজন ভালো চিকিৎসক হতে হলে শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করলেই চলবে না; রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ, নিয়মিত জ্ঞানচর্চা এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান রাখতে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগী হতে হবে।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মা-ও-শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের ১৫তম ব্যাচের (২০২৫-২০২৬) ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ইন্টার্নশিপ সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন।
ইন্টার্নশিপকে চিকিৎসকদের পেশাগত জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উল্লেখ করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এমবিবিএস পাসের পর এক বছরের ইন্টার্নশিপে অর্জিত ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা একজন চিকিৎসকের ভবিষ্যৎ দক্ষতা ও পেশাগত ভিত্তি গড়ে দেয়। এ সময় নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি রোগীর চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকতে হবে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পরও পড়াশোনা অব্যাহত রেখে এফসিপিএস, এমডি, এমএসসহ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানই দক্ষ চিকিৎসকের পরিচয়
চিকিৎসকদের অনুসন্ধানী মনোভাবের ওপর গুরুত্বারোপ করে মেয়র বলেন, একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু রোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া নয়; বরং রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ফলাফল পর্যন্ত অনুসরণ করা। উদাহরণ হিসেবে ফুসফুসে পানি জমার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণ, যক্ষ্মা কিংবা ক্যানসারসহ বিভিন্ন কারণে ফুসফুসে পানি জমতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে সঠিক রোগ নির্ণয় করতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে শেখার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। রোগীর পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের পর সেই নমুনার ফলাফল কী এসেছে, রোগের প্রকৃত কারণ কী এবং পরবর্তী চিকিৎসা কী হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো একজন দক্ষ চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রয়োজন সঠিক তথ্য ও গবেষণা
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতি তুলে ধরে মেয়র বলেন, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় চিকিৎসকদের নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকা জরুরি। গত কয়েক বছরের রোগী ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যালোচনার মাধ্যমে রোগের প্রবণতা, সংক্রমণের ধরন এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য একটি দল নিয়ে কাজ করছে। রোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে চিকিৎসকদের যাচাই করা তথ্য ব্যবহার করতে হবে। অনুমাননির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রোগের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মেয়র তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে ৪১ জন, ২০২৩ সালে ১০৭ জন, ২০২৪ সালে ৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে ২৪ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, এর মধ্যে নগরীতে ১০ জন এবং জেলার অন্যান্য এলাকায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হয়।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে গুরুত্ব
চট্টগ্রাম নগরীর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে মেয়র বলেন, শিশুদের টিকাদান, কিশোরীদের জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকাদান এবং কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি অক্টোবর মাসজুড়ে স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও চিকিৎসকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার মাধ্যমে অসংক্রামক ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
রোগীর সঙ্গে ভালো আচরণও চিকিৎসার অংশ
নবীন চিকিৎসকদের উদ্দেশে মেয়র বলেন, রোগীর সঙ্গে আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল আচরণ চিকিৎসা পেশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ। রোগী ও তাঁর স্বজনদের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা, রোগের অবস্থা সহজ ভাষায় বোঝানো এবং চিকিৎসার বিষয়ে আস্থা জোগানো প্রয়োজন। বিশেষ করে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকের জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর ব্যবহারও রোগীর আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একজন ভালো চিকিৎসক হওয়ার জন্য পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিতের আহ্বান
দেশের ওষুধশিল্পের গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, রোগীদের নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ নিশ্চিত করা জরুরি। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুণগত মানের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে চিকিৎসার কার্যকারিতা বজায় থাকে এবং চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শাহাদাত হোসেন আশা প্রকাশ করেন, চট্টগ্রাম মা-ও-শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের নবীন চিকিৎসকেরা তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, গবেষণামুখী চিন্তা, পেশাগত নিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে দেশের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরাই নতুন রোগের প্রতিষেধক ও ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মা-ও-শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি, মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক এবং ১৫তম ব্যাচের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা উপস্থিত ছিলেন।