বাঁশখালীর সাগরপাড়ের প্রত্যন্ত পূজামণ্ডপে ডিসি জাহিদ, নিরাপত্তার আশ্বাস

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম চাম্বলের সাগরপাড়ের প্রত্যন্ত জেলেপল্লি। দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস এই এলাকায়। এখানকার বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দিরে ১৯৮৪ সাল থেকে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। কিন্তু দীর্ঘ ৪২ বছরে কোনো জেলা প্রশাসক এই মন্দিরে আসেননি বলে দাবি স্থানীয় আয়োজকদের। এবার মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় সেই জেলেপল্লির পূজামণ্ডপে হাজির হলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। আজ রবিবার তাঁকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

শুধু আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন নয়, জেলা প্রশাসক ঘুরে দেখেন পূজামণ্ডপ, কথা বলেন আয়োজক ও স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে। তাঁদের উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। নারীদের হাতে তুলে দেন শাড়ি। পাশাপাশি নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপনে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গুরুধন দাশ বলেন, ‘দরিদ্রপীড়িত এই জেলেপল্লিতে ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা অনেক অনেক আনন্দিত। তিনি নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে আমরা অনেক আশ্বস্ত হয়েছি।’

কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন দাশের কাছেও জেলা প্রশাসকের এই সফর ছিল অপ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, ‘এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেলা প্রশাসক আমাদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন, এটা কল্পনাও করিনি।’

রতন দাশের দাবি, ১৯৮৪ সালে মন্দিরে দুর্গাপূজা শুরুর পর গত ৪২ বছরে এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক সেখানে এসেছেন।

জেলেপল্লির মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষসহ সব সম্প্রদায় যাতে সমানভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, এই দেশে সব জাতি, সব সম্প্রদায়, সে যত ছোটই হোক, সরকার তাদের পাশে আছে। তারা তাদের উৎসবগুলো আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবে।’

জেলেপল্লিতে আসার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের জেলে ভাইয়েরাও যাতে এই উৎসব নির্বিঘ্নে, আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য আজ আমরা এই জেলেপল্লিতে এসেছি।’

মন্দিরের আয়োজনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘জায়গা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে, সবাই এসে আনন্দ উদযাপন করতে পারলেন কি না, তাঁদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতি পালন করতে পারলেন কি না।’

পশ্চিম চাম্বলের এই এলাকায় অতীতে পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাবাজার জলদাশপাড়ার পূজামণ্ডপে হামলার পাশাপাশি বাঁশখালীর ১৫টি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে একটি মন্দিরে প্রতিমা এবং ১৪টি মন্দিরের তোরণ ভাঙচুর করা হয়। সংঘর্ষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন বলে জানা যায়।

ওই ঘটনায় পুলিশ তিনটি মামলা করে। মামলাগুলোতে এজাহারনামীয় ৬২ জনসহ বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ২১ জনকে।

এমন প্রেক্ষাপটে এবার দুর্গাপূজায় যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, উৎসবের আনন্দ যাতে কেউ বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

মহাসপ্তমীতে বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এগুলো হলো পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ, সাধনপুর পল্লীমঙ্গল সমিতি মণ্ডপ এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক পূজামণ্ডপগুলোর সাজসজ্জা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণের পাশাপাশি দুটি মণ্ডপে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

জাহিদুল ইসলাম জানান, এবার চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূজামণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা ও জিআর চালের বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে।

প্রতিটি মণ্ডপের খোঁজখবর রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত মণ্ডপ পরিদর্শন করছেন। ট্যাগ অফিসাররাও আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন জানান, পূজামণ্ডপের সংখ্যা বাড়ায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক এলাকার মণ্ডপগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তাঁরা। উৎসব শেষ হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অন্যতম শক্তি হিসেবে তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, এ দেশে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। একে অপরের উৎসবে অংশ নিচ্ছেন, বিপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আমাদের হয়তো অনেক প্রাচুর্য না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের এই যে বন্ধন, এটি অনেক দৃঢ়, অনেক শক্তিশালী।’

প্রধানমন্ত্রীর ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার কথা উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি রয়েছে। এসব স্বকীয়তা বজায় রেখেই সবাইকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে চট্টগ্রাম সফরে আসবেন। তাঁর সফরের ঘোষণায় বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামজীদুর রহমান তন্ময় এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।

মিশকাতুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে কোনো ভেদাভেদ নেই।’ তিনি পূজার নিরাপত্তায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং প্রত্যন্ত এলাকায় জেলা প্রশাসকের উপস্থিতির প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত মানুষের মুখে হাসি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবার মুখের হাসি দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। আমাদের হয়তো অনেক উন্নত অবকাঠামো নেই, কিন্তু আমাদের অনেক বড় মন আছে, হৃদয় আছে।’

স্থানীয় মানুষকে আশ্বস্ত করে তিনি আরও বলেন, ‘পুরো প্রশাসন আপনাদের পাশে আছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আপনাদের পাশে আছেন। আপনারা আনন্দ করবেন, উৎসব করবেন, আপনাদের ধর্মীয় সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করবেন।’

সাগরপাড়ের পশ্চিম চাম্বলের এই দরিদ্র জেলেপল্লিতে চার দশকের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। স্থানীয় আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এত বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি তাঁদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি প্রশাসনের সরাসরি সহযোগিতার আশ্বাসও পেয়েছেন তাঁরা।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গুরুধন দাশ বলেন, ‘দরিদ্রপীড়িত এই জেলেপল্লিতে ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা অনেক অনেক আনন্দিত। তিনি নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে আমরা অনেক আশ্বস্ত হয়েছি।’
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন দাশের কাছেও জেলা প্রশাসকের এই সফর ছিল অপ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, ‘এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেলা প্রশাসক আমাদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন, এটা কল্পনাও করিনি।’

 

মন্তব্য করুন