
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরের জন্য সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন।
আইএলও বাংলাদেশ এর উদ্যোগে গতকাল ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ সকাল ১০:০০ ঘটিকায় চট্টগ্রামের দ্য পেনিনসুলা চিটাগংয়ের ডালিয়া হলে আয়োজিত “Divisional Consultation Workshop on the National Business Formalization Strategy and Roadmap“ শীর্ষক বিভাগীয় পরামর্শ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
কর্মশালায় ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের গুরুত্ব, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, ব্যবসা পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ প্রায় ৩০ জন অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনকে সবার আগে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় না। এ ক্ষেত্রে চাহিদা ও জোগানের বিষয়গুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ব্যবসা পরিচালনা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। তাই ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির কার্যকর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হবে। এ জন্য বিদ্যমান সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান নির্ধারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রায় সিংহভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতাভুক্ত হওয়ায় সব খাতকে একসঙ্গে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক উদ্যোগ, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি জানান, ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এর ভিত্তিতে দেশের আটটি বিভাগে বিভাগীয় পর্যায়ে পরামর্শ কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে এ কর্মশালার মাধ্যমে সেই কার্যক্রমের সূচনা হয়েছে। কর্মশালায় চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এলে কী কী সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। সরকার, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিল্প পুলিশ-০৩, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম শিল্প পুলিশের প্রতিষ্ঠা, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, শিল্প খাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুকূল ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে শিল্প পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তার এ ধরনের সময়োপযোগী আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রক্রিয়াকে কেবল ব্যয় হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। স্থানীয় সরকার উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএলও বাংলাদেশের কনসালট্যান্ট আলি সাবেত। তিনি ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের প্রয়োজনীয়তা, এ-সংক্রান্ত কৌশল ও রোডম্যাপ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন আইএলও বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট অফিসার রুমান ইসতিয়াক রাফিন।
কর্মশালায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিএসটিআই, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি (নাসিব), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি, সিটি ব্যাংক পিএলসি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়তন (আইআরআই) এবং চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা আনুষ্ঠানিককরণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।









