
মোঃ সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা: চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চেতনানাশক দ্রব্য সেবন করিয়ে অটোরিক্সাচালক মোহাম্মদ আইয়ুব আলীকে (৫৫) হত্যা এবং অটোরিক্সা ছিনতাইয়ের বহুল আলোচিত মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানের পর আন্তঃজেলা চেতনানাশক চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত দুর্র্ধষ আসামি “গালকাটা জামাল”সহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে আনোয়ারা থানা পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের কৈয়গ্রামের সোলেমান হাজীর বাড়ির মৃত আব্দুল হকের ছেলে মোহাম্মদ জামাল ওরফে গালকাটা জামাল (৫২) এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের আব্দুল মালেকের ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (৩১)।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত আইয়ুব আলী দৈনিক ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চালাতেন। গত ২০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিদিনের মতো জীবিকার তাগিদে অটোরিক্সা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। পরে সকাল ১১টার দিকে আনোয়ারা থানাধীন শোলকাটা রাস্তার মোড় এলাকায় পথচারীরা তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করেন।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থার অবনতি দেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে টানা কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মৃত্যু হয় আইয়ুব আলীর।
পরে চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও তদন্তে ধারণা করা হয়, তাকে চেতনানাশক জাতীয় বিষাক্ত দ্রব্য খাওয়ানো হয়েছিল। এ ঘটনায় অটোরিক্সার মালিক মোহাম্মদ আলী আহাম্মদ বাদী হয়ে আনোয়ারা থানায় হত্যা, চেতনানাশক প্রয়োগ ও অটোরিক্সা চুরির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনাটি প্রথমদিকে ছিল সম্পূর্ণ “ক্লুলেস”। হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী কিংবা দৃশ্যমান আলামত না থাকায় তদন্তে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। পরে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, মোবাইল ট্র্যাকিং, গোপন নজরদারি ও বিশ্বস্ত সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ আলম এর সার্বিক নির্দেশনায়, আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহনুর রহমান সোহাগ এর তত্ত্বাবধানে এবং আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ জুনায়েত চৌধুরী এর নেতৃত্বে এসআই শিমুল চন্দ্র দাসের নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ টিম অভিযান পরিচালনা করে।
রোববার ভোরে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া ও পটিয়া এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতারকৃত জামাল ওরফে গালকাটা জামাল দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে আন্তঃজেলা চেতনানাশক চক্রের সঙ্গে জড়িত। সে চট্টগ্রাম মহানগরী, মাদারীপুর, খাগড়াছড়ি, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে অটোরিক্সা ছিনতাই ও হত্যার ঘটনায় জড়িত। তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টির বেশি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রটি সাধারণত দরিদ্র ও অসহায় পরিবহনচালকদের টার্গেট করত। যাত্রী সেজে চালকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে চেতনানাশক প্রয়োগ করা হতো। চালক অচেতন হয়ে পড়লে অটোরিক্সা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত তারা। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা প্রাণ হারাতেন।
আইয়ুব আলীর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তার স্বজনদের।
আনোয়ারা থানা পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত তা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ছিনতাইকৃত অটোরিক্সা উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।









