
নিউজগার্ডেন ডেস্ক: রিহ্যাব রিজিওনাল অফিস চট্টগ্রামে আজও স্বৈরাচারের দোসরদের কবলে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বেশিরভাগ সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও রিহ্যাব চট্টগ্রামে বহাল তবিয়তে রয়েছেন আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্টরা। আওয়ামী লীগের পতনের পর যখন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে রদবদল এসেছে, তখন রিহ্যাবে এখনো রাজত্ব করছেন শেখ হাসিনা আমলের দোসররা।
রিহ্যাব চট্টগ্রাম রিজিওনাল চেয়ারম্যান হাজি দেলোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের আমলে ওবায়দুল কাদেরের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা মামলা, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ। এমনকি তিনি এখন একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। ঢাকার একটি আদালত সম্প্রতি তাকে আট মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও ২১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। তবুও তিনি রিহ্যাবের চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে দাপটে বৈঠক করছেন বিভিন্ন সংস্থার সাথে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিডিএ চেয়ারম্যান, চসিক মেয়র প্রায় সব জায়গায় দোলোয়ার হাজির হচ্ছেন রিহ্যাবের প্রতিনিধি হিসেবে। গত এক বছরে অন্তত ২০টি বৈঠকে তার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ১৭ জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতে দায়ের করা মামলায় তাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এজেন্ট, ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার ও আজিমপুর হত্যাকান্ডের অর্থায়নকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে ২৩ জুলাই বাড্ডা থানায় দায়ের করা আরেক মামলায় শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে তাকে ১৬ নম্বর আসামি করা হয়। অথচ এসব গুরুতর অভিযোগের পরও তিনি নির্বিঘেœ সংগঠনের নেতৃত্বে বহাল রয়েছেন।
বিশিষ্ট আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান বলেন, “সরকারি-আধাসরকারি কোনো সংস্থায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি কোনো পদে থাকতে পারে না। বেসরকারি সংগঠন হলেও এটা নৈতিক স্খলন। তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় আছে। সে এখন ফেরারি, তাকে খুঁজে বের করা উচিত।”
রিহ্যাব চট্টগ্রামের একাধিক সদস্যের মতে, আওয়ামী শাসনামলে রিহ্যাব ছিল আওয়ামীপন্থিদের ‘দাসত্বের রাজত্ব’। প্রায় একযুগ কোনো নির্বাচন ছাড়াই তারা সংগঠনটি দখলে রেখেছিল। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তথাকথিত নির্বাচনে বিএনপি বা ভিন্নমতের কাউকে সুযোগ না দিয়ে আবারও আওয়ামী ঘনিষ্ঠরা নেতৃত্ব নেয়। অথচ গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকার পতনের পর অন্য সংগঠনগুলোতে পরিবর্তন এলেও রিহ্যাবে সেই দোসররাই বহাল রয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী সমাজের অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন বা বিদেশে পালিয়েছেন। কিন্তু রিহ্যাবের এই নেতৃত্ব রাজনৈতিক রঙ বদলে বহাল থাকার চেষ্টা করছে। হত্যামামলার আসামি, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত হয়েও তারা রিহ্যাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের পদ আঁকড়ে রেখেছে।
রিহ্যাব পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মনজুরুল ফরহাদ বলেন, “সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কেউ রিজিওনাল চেয়ারম্যান থাকতে পারে না। যদি প্রমাণ থাকে তবে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।” তবে সচিব বানার্ড বাবুল দায়িত্ব এড়িয়ে বলেন, “চেয়ারম্যান বা পরিচালকের ব্যক্তিগত মামলার বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। আমার কাজ শুধু অফিস পরিচালনা করা।”
রিহ্যাবের সদস্যরা বলছেন, আবাসন খাত জিডিপির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৩৮টি লিংকেজ শিল্প। অথচ আওয়ামী ঘনিষ্ঠ অযোগ্য নেতৃত্বে সংগঠনটি থাকলে এই খাত আরও গভীর সংকটে পড়বে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্রান্তিলগ্নে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয়, আওয়ামী দোসরদের স্বার্থ রক্ষাই যেন রিহ্যাবের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে।
রিহ্যাব চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান হাজি দেলোয়ার হোসেন সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে তার কর্মকান্ডের কারণে তার বিরুদ্ধে হত্যামামলা দায়ের হয়। হাজি দেলোয়ার ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাতকানিয়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাছাড়া তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সেক্টর কমান্ডার ফোরামের সাবেক সহ-সভাপতি। ১৭ বছরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে দেলোয়ার হোসেন সাজাপ্রাপ্ত হওয়া এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় কোনো মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে এমনটা জানেন না জানিয়ে উল্টো মামলার কপি চান। এ বিষয়ে জানতে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি রিহ্যাব কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান মো. ওয়াহিদুজ্জামান। বিগত আওয়ামী সরকারের উদাসীনতা ও অযোগ্যতার কারণে এই খাতে গভীর সমস্যা সৃষ্টি হয়। নতুন করে দেশ গড়ার এই ক্রান্তিলগ্নে স্বৈরাচারের দোসর এবং অযোগ্য নেতৃত্বে রিহ্যাবকে কুক্ষিগত করে রাখলে আবাসন খাত আরও গভীর সমস্যায় নিমজ্জিত হবে।
শুধু আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা নয়, হত্যা মামলার আসামি হয়েও গত এক বছরে বিভিন্ন সংস্থার সাথে অন্তত ২০টি বৈঠক করেছেন রিহ্যাব চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন। এসব মিটিংয়ের ছবি সহ সংবাদও প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এর মধ্যে পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে সিডিএ চেয়ারম্যান, চসিক মেয়র প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অফিসে ছুটেছেন তিনি। স্বৈরাচারের দোসররা পালাতক থাকলেও দেলোয়ার সবাইকে যেন বসে নিয়েছেন।
এর আগেও দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালে দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী ছেমন আরা বেগমের বিরুদ্ধে ঢাকার রমনা মডেল থানায় পৃথক দুইটি মামলা দায়ের করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাছাড়া তার প্রতিষ্ঠান আরএফ বিল্ডারর্স এ ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার এবং চুক্তি মতো ফ্ল্যাট বুঝে নিতে গিয়ে হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগ তুলেছিলেন এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ২০২১ সালের নভেম্বরে চাঁদাবাজির মামলায় কক্সবাজারে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। দুদকের মামলাও গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন।









