মাজার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, বিরোধ কাম্য নয়

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: মাজার শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি চেতনা। মানুষের প্রার্থনার কেন্দ্র, মানসিক শান্তির আবাস। যুগে যুগে মানুষ যেমন এখানে এসেছে হৃদয়ের আশা নিয়ে, তেমনি ভবিষ্যতেও আসবে বিশ্বাস ও ভালোবাসা নিয়ে। কোনভাবেই মাজার নিয়ে বিরোধ কাম্য নয়। পাইরোল সৈয়দ আকবর শাহ মাজার বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে সৈয়দ আকবর শাহ (রহঃ) এর মাজার শরীফ অবস্থিত। এটি একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ মনস্কামনা পূরণের জন্য এখানে জিয়ারত করতে আসেন।

শান্ত পরিবেশ, চারপাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রামটির মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন সুফি সাধক সৈয়দ আকবর শাহ (রহ:) এর সমাধি। ৫০ বছর ধরে এই সমাধি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, ভক্তদের আধ্যাত্মিক আবেগ ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু।

মাজার আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এটি আধ্যাত্মিক আবেগ, শ্রদ্ধা এবং সাধনার একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ধর্মপ্রাণ মানুষকে আধ্যাত্মিকতার দিকে পরিচালিত করে। এটি সাধক, বিশেষ করে সুফি সাধকদের স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

বর্তমানে যারা মাজার পরিচালনা করছেন এরা সবাই এলাকার জনসাধারণ। সবাই শিক্ষিত এবং সরকারি কর্মজীবী, শিল্পপতি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী। এদের টাকার প্রতি কোন লোভ-লালসা নেই। মাজারের টাকা দিয়ে এরা এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে। ভবিষ্যতেও এদের অনেক পরিকল্পনা আছে উন্নয়নমূলক কাজ করার। সর্বোপরি এরাই মাজার পরিচালনা কমিটির মধ্যে এলাকার প্রতিটি ঘর থেকে লোকজন নিয়ে কমিটির সদস্য করেছেন এবং মাজারের দান বাক্স খোলার সময় সবাই উপস্থিত থাকেন বলে জানা যায়।

অতীতে যারা মাজার পরিচালনা করেছেন তারাও এলাকার জনসাধারণ। তাদের প্রতি উক্ত এলাকার মানুষের ক্ষোভ হচ্ছে, তারা এলাকার মানুষকে কোনভাবেই মাজারের কোন কাজে ডাকতো না। টাকা পয়সার কোন হিসাব এলাকাবাসীকে দিত না, নিজেরা নিজেরা টাকা গণনা করে নিয়ে যেত এবং অর্থ লুটপাট করত। এলাকাবাসীর অভিযোগ নজরুল ইসলাম ওয়াক্ফ অফিসকে দান বক্সের টাকার আয় যা দেখাতো বর্তমানে তার তিন চার গুণ টাকা পাওয়া যাচ্ছে এতে প্রমাণ হয় যে, তারা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তারা নিজেরাই সবকিছু করতেন।

২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর নতুন বাংলাদেশে তাদের কোন ভূমিকা না থাকাতে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি গঠন করে মাজারটি পরিচালনা করে আসছে। এলাকার মানুষ মাজারের কাজে সম্পৃক্ত হতে পেরে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন। এলাকার মানুষের দাবী, স্বচ্ছতা ও জবাবদীহিতার মাধ্যমে এ মাজার পরিচালনা করতে হবে।

মাজারটির কোন আওলাদ না থাকাতে আমাদের এলাকার সকল মানুষ এ মাজার দেখভাল করার অধিকার রাখে। সে কারণে সকলে মিলেমিশে মাজার পরিচালনা করুক সেই কামনা এলাকাবাসীর। অতীতের মত জগদ্দল পাথরের মত কেউ চেপে বসে মাজারের অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে সেই ব্যাপারে সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা রয়েছে চলমান এ মাদরাসা শিক্ষার কার্যক্রমকে আরো বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা। এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। এলাকাবাসী শীঘ্রই মাদরাসা ভবনকে কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে আছে সাচ্ছা আলেম তৈরির জন্য গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষার নিশ্চয়তা।

এ মাজারে প্রতি বছর ১৮ মাঘ বার্ষিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে কমপ্লেক্সের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য মাদরাসা ও মাজারের নামে জায়গা ক্রয় করা হয়েছে। সব মহলের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে চলমান কার্যক্রম আরো বেগবান হবে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সব ধর্মের, সব মতের মানুষ সহিংসতাকে মোকাবিলা করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবেন। মাজার বা দরবারের লোকজন কারো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মাজার ও দরবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থেই মাজার ও দরবারের প্রতি এই সহিংসতাকে রোধ করতে হবে। মাজারে সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। এটিকে নিছক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা মোকাবিলা করা যাবে না। এটি নিয়ে সামাজিকভাবে কাজ করতে হবে।

এ ব্যাপারে মো: নজরুল ইসলাম সাদা বলেন, আমার পিতা মরহুম আলী হোসেন এ মাজার শরীফটি খাদেম হিসেবে দেখভাল করে এসেছেন। আমি ইসিভুক্ত মতোয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এলাকার শিক্ষানুরাগী ও দানশীল গুণীজনদের সাথে নিয়ে দৃষ্টি নন্দন মাজার ও কমপ্লেক্স করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমাদের প্রত্যাশা রয়েছে চলমান এ মাদরাসা শিক্ষার কার্যক্রমকে আরো বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করার। এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে নজু মিয়ার ওয়ারিশগণ জানান, আমরা প্রাথমিক তদন্ত করে জানতে পারি আকবর শাহ (র:) এর কোন ওয়ারিশ ছিল না। তাঁর ওয়ারিশ না থাকায় এই মাজার দেখাশোনা করার জন্য নজু মিয়া জীবিত থাকাকালীন আবদুল মজিদ ও তার সন্তান আলী হোসেনকে খাদেম হিসেবে দায়িত্ব দেন। আবদুল মজিদ নজরুল ইসলামের দাদা ও আলী হোসেন তার পিতা।

এই সমস্ত জায়গা গুলোর আরএস, পিএস ও বিএস জরিপ মূলে মালিক হাজী নজুমিয়া গং। কিন্তু বিএস জরিপ কালীন সময় নজুমিয়া মৃত্যুবরণ করলে নজরুল ইসলামের পিতা আলী হোসেন এর নাম ভুলবশত মন্তব্য কলামে লিপিবদ্ধ হয়। সেই সুযোগ গ্রহণ করে নজরুল ইসলাম ওয়াকফ অফিসকে প্রভাবিত করে ২০১২ সালে স্বৈরাচার দোসরের সহযোগিতায় ভুয়া মতোয়াল্লি নিয়ে আসেন। কোন কমিটি গঠন না করে এককভাবে মাজারের পরিচালনা করেন।

কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতো। এ নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং সরকারের পট পরিবর্তনের পর এলাকার জনগণ নজুমিয়ার ওয়ারিশদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা করে যাচ্ছে।

নজু মিয়ার ওয়ারিশগণ ভুয়া মতোয়াল্লি পরিবর্তনের জন্য ওয়াক্ফ অফিসে অভিযোগ দাখিল করেন যা বর্তমানে শুনানি পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বি এস মন্তব্য কলামের সংশোধনের জন্য মামলা করেছেন। এলাকায় প্রাথমিক তদন্ত করে জানা গেল এই জায়গার মূল মালিক হাজী নজুমিয়া গং। যেহেতু মূল মালিক ব্যতীত কেউ মতোয়াল্লি হওয়ার অধিকার রাখেন না।

 

মন্তব্য করুন