
একসময় বাংলাদেশি সমাজে একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল-“সন্তানই বার্ধক্যের ভরসা।” জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, শ্রম আর ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে সন্তানকে বড় করেন পিতা-মাতা। কিন্তু সময় বদলেছে। নগরায়ণ, একক পরিবারের প্রসার, কর্মব্যস্ত জীবন এবং পরিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধের প্রভাবে আজ অনেক বয়স্ক পিতা-মাতা নিজেদের পরিবারেই অবহেলিত। কেউ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন, কেউ আবার নিঃসঙ্গতার ভারে নুয়ে পড়ছে.
বাংলাদেশি সমাজে বয়স্ক পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও যতœ নেওয়া বরাবরই একটি নৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু নগরায়ণ, একক পরিবারের (Nuclear Family) প্রসার এবং পরিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধের কারণে বর্তমানে অনেক বয়স্ক পিতা-মাতা অবহেলা ও আর্থিক অনিরাপত্তার শিকার হচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে। এই আইন সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও পরিচর্যার দায়িত্বকে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতায় পরিণত করেছে।
এই আইন প্রণয়নের পূর্বে পিতা-মাতার ভরণপোষণের বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত আইন (Personal Law)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, আর্থিকভাবে সক্ষম সন্তান তার অভাবগ্রস্ত পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে বাধ্য। একইভাবে অন্যান্য ব্যক্তিগত আইনেও পিতা-মাতার ভরণপোষণকে সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে ২০১৩ সালের পূর্বে বাংলাদেশে এ দায়িত্ব কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কোনো স্বতন্ত্র আইন ছিল না।
২০১৩ সালের আগে বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার জন্য কোনো বিশেষ আইন বিদ্যমান ছিল না। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির (ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব) ৪৮৮ ধারায় ভরণপোষণ-সংক্রান্ত কিছু বিধান ছিল, তবে ২০০৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে তা বিলুপ্ত করা হয়। ফলে পিতা-মাতার অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি পৃথক আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং এরই ফলস্বরূপ পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ প্রণীত হয়।
আইনের ৩ ধারায় সন্তানের ওপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রত্যেক সন্তান তার পিতা ও মাতার যথাযথ ভরণপোষণ, নিরাপত্তা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে আইনগতভাবে বাধ্য। একাধিক সন্তান থাকলে সকলকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আলাদা থাকতে বাধ্য করতে পারবে না কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারবে না। এছাড়া সন্তানদের নিয়মিত পিতা-মাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং আলাদা থাকলে নিয়মিত সাক্ষাৎ করা বাধ্যতামূলক। পিতা-মাতা আলাদা বসবাস করলে সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের জন্য যুক্তিসঙ্গত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করলে এই দায়িত্ব নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দাদা-দাদি বা নানা-নানির প্রতিও প্রযোজ্য হয়।
আইনের ৫ ধারায় সন্তানের আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো সন্তান ৩ বা ৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তাকে সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা যেতে পারে এবং জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ থেকে বিরত রাখে বা বাধা সৃষ্টি করে, তবে তাকেও একই ধরনের শাস্তির আওতায় আনা হবে। আইনের ৬ ও ৭ ধারা অনুযায়ী, এ আইনের অধীন অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপসযোগ্য। এ ধরনের মামলার বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে, ক্ষতিগ্রস্ত পিতা-মাতার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
এই যুগান্তকারী মামলায়(Landmark Case) সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে যে, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর বিধানসমূহ আদালতের মাধ্যমে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য। Aleya Begum v. Lance Nayek Abul Kalam Azad (২০১৫) মামলায় আদালত দেখতে পান যে, জ্যেষ্ঠ পুত্র তার বিধবা মাকে আর্থিক সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার প্রতি আইনগত দায়িত্ব পালন করেননি। আদালত জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পুত্রবধূ উভয়ের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করেন এবং জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। এই রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, পিতা-মাতার প্রতি আইনগত দায়িত্ব অবহেলা করলে সন্তানকে ফৌজদারি দায়ের মুখোমুখি হতে হবে এবং এই আইন বয়স্ক পিতা-মাতার জন্য কার্যকর আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
ভারতের Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, ২০০৭-এর সঙ্গে তুলনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় আইনে জৈবিক পিতা-মাতা, দত্তক পিতা-মাতা, সৎ পিতা-মাতা এবং নিঃসন্তান প্রবীণ নাগরিকরাও আইনের সুরক্ষা পান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আইন প্রধানত জৈবিক পিতা-মাতা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া ভারতীয় আইনে ভরণপোষণের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হলেও বাংলাদেশের আইনে কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি; বরং সন্তানের আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
আইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক মানুষ তাদের আইনগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তাই বয়স্ক পিতা-মাতার অধিকার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইন শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক আইন, যা পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের নৈতিক দায়িত্বকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় রূপ দিয়েছে। এই আইন বয়স্ক পিতা-মাতাকে অবহেলা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা প্রদান করে এবং সন্তানদের তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে বাধ্য করে। এর কার্যকর বিধান এবং বিচারিক স্বীকৃতির মাধ্যমে আইনটি পারিবারিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাংলাদেশের পিতা-মাতার মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
লেখক: জুবাইদা আক্তার চৌধুরী, নওশিন সারা, সামিহা জামান সারাহ্, মৌনতা বড়ুয়া, মোহাম্মদ আবির হোসেন








