
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পুরোনো জাহাজের একটি ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে আট শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। দুর্ঘটনার পর গ্যাস লিকেজ বন্ধ, উদ্ধার অভিযান ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও কাজ করেছে।
এ ঘটনায় সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দুর্ঘটনায় মালিকপক্ষের কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত এক শ্রমিককে দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে থাকবে সরকার। ইতোমধ্যে মালিকপক্ষ নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে মালিকপক্ষের কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সেনাবাহিনীও কাজ করেছে।
এ সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
ট্যাংক থেকে ছড়ায় বিষাক্ত গ্যাস
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। একে একে আটজনের মৃত্যু হয়। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর সানী জলদাশ (২২), পলাশ জলদাশ (২৭), মুনছুর আলী (৪০), নাসির উদ্দিন (৩৮), জামালপুরের হাবীবুর রহমান, গাইবান্ধার খোকন ও আব্দুল আমীল রানা রয়েছেন। নিহত আরও একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।
নিহতদের মধ্যে ইয়ার্ডের ইয়ার্ড ইনচার্জ, সেফটি ইনচার্জ ও ফোরম্যানও ছিলেন বলে জানা গেছে। এতে ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে আগেই মামলা
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ তালুকদার জানান, ফেরদৌস স্টিলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তা ত্রুটি এবং বন্ধের দিনেও কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে প্রায় এক মাস আগে তিনি বাদী হয়ে শ্রম আদালতে মামলাও করেছিলেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তবে ইয়ার্ড মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ দাবি করেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল এবং শুধু হাউসকিপিংয়ের কাজ চলছিল। কিন্তু বন্ধের দিনে ইয়ার্ড ইনচার্জ, সেফটি ইনচার্জ ও ফোরম্যান সেখানে কেন ছিলেন—এ বিষয়ে তার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএসবিআরএরও তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জাহাজভাঙা শিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানান, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তাদের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হবে।
ইয়ার্ড মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানিয়েছেন, আহতদের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধিবিধানের বাইরে সার্বিক সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের সঙ্গে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পে বিষাক্ত গ্যাস ও দাহ্য পদার্থের ঝুঁকি নতুন নয়। তবে নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে আগেই নোটিশ ও মামলা থাকার পরও এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি ও বিএসবিআরএর তদন্তে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।









