হাসপাতালের কাজ কি শুধু রোগ সারানো, নাকি রোগ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখা?

 

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন: একটি হাসপাতালের সাফল্য আমরা সাধারণত কী দিয়ে মাপি? কতজন রোগী চিকিৎসা পেলেন, কতটি অস্ত্রোপচার হলো, কতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন কিংবা কতটা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে—এসবই আমাদের পরিচিত সূচক।

কিন্তু কখনো কি আমরা অন্য একটি প্রশ্ন করেছি—একটি হাসপাতাল মানুষকে অসুস্থ হওয়ার আগেই সচেতন করতে কতটা ভূমিকা রাখছে?

আমার দৃষ্টিতে, স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু রোগ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কারণ ভালো স্বাস্থ্যসেবা শুধু অসুস্থতার চিকিৎসা করে না; সুস্থ থাকার পথটিও সহজ করতে সাহায্য করে।

অসুস্থ হওয়ার আগেও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন আছে

অনেক মানুষ শারীরিক সমস্যা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চান না। কেউ ব্যস্ততার কারণে, কেউ সচেতনতার অভাবে, আবার কেউ লক্ষণকে তেমন গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।

কিছু রোগের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব জটিলতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, উপযুক্ত সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ রোগ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।

তবে সবার জন্য একই ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক সেবা নির্ধারণ করা উচিত।

এখানে হাসপাতালের ভূমিকা শুধু পরীক্ষা বা চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া নয়; মানুষকে কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে, তা সহজ ভাষায় বুঝতে সাহায্য করাও।

ডিজিটাল মাধ্যম বদলে দিতে পারে স্বাস্থ্যসচেতনতার ধরন

আজ একজন মানুষ কোনো লক্ষণ অনুভব করলে প্রথমেই গুগলে খুঁজতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও দেখতে পারেন কিংবা পরিচিতজনের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।

এতে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে। কিন্তু সব তথ্য সঠিক নয়, আর সঠিক তথ্যও সবসময় সঠিকভাবে বোঝা হয় না।

এই বাস্তবতায় হাসপাতালের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য প্রকাশ, সাধারণ ভুল ধারণা দূর করা, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন তা ব্যাখ্যা করা এবং নির্ভরযোগ্য সেবার পথ দেখানো—এসব উদ্যোগ মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

এখানে ডিজিটাল যোগাযোগের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়।

লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া, যাতে তিনি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

স্বাস্থ্যসচেতনতা মানেই ভয় তৈরি করা নয়

স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণায় অনেক সময় ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো রোগের ঝুঁকি তুলে ধরে মানুষকে দ্রুত পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয়।

কিন্তু ভয় তৈরি করা আর সচেতনতা তৈরি করা এক বিষয় নয়।

দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য যোগাযোগে ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন, তবে অতিরঞ্জিত দাবি বা অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়। কোন লক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন এবং কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য—এসব বিষয় সহজভাবে বোঝানো বেশি কার্যকর।

বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মতো বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুল তথ্য দূর করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি হাসপাতালের যোগাযোগ তাই শুধু সেবা সম্পর্কে জানাবে না; মানুষকে স্বাস্থ্য বিষয়ে দায়িত্বশীলভাবে ভাবতেও সাহায্য করবে।

প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি

একটি হাসপাতালকে আর্থিকভাবে টেকসই হতে হয়। চিকিৎসক, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রবৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে পরস্পরের বিপরীতে দেখার প্রয়োজন নেই।

মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা, উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব বোঝানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা গ্রহণের পথ সহজ করা—এসব উদ্যোগ ব্যক্তি ও সমাজের উপকারে আসতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসার চাহিদা তৈরি না করা। স্বাস্থ্যসচেতনতার নামে মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা দায়িত্বশীল পদ্ধতি নয়।

আমার কাছে সফল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

হাসপাতালের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন

ভবিষ্যতের হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসার স্থান হিসেবে দেখলে স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।

একটি হাসপাতাল তার চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট, চিকিৎসকদের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক আলোচনা, উপযুক্ত স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম এবং কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তবে এসব উদ্যোগের তথ্য হতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে যাচাই করা।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের উচিত মানুষের প্রশ্ন শোনা। মানুষ কোন বিষয় নিয়ে বিভ্রান্ত, কোন রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা রয়েছে এবং কোন তথ্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—এসব বোঝা গেলে স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

এখানে ডিজিটাল, মার্কেটিং, জনসংযোগ এবং চিকিৎসা বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের উপস্থাপন যত আকর্ষণীয়ই হোক, তার যথার্থতা ও দায়িত্বশীলতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের শুধু নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক হাসপাতাল কিংবা উন্নত চিকিৎসার কথা বললে চলবে না। মানুষ কীভাবে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

আমার বিশ্বাস, হাসপাতালের দায়িত্ব চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যেই শেষ হয় না। মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করা, নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অবশ্য সব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, আর সব স্বাস্থ্যসমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করাও যায় না। কিন্তু সচেতনতা, উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের হাসপাতালকে শুধু এই প্রশ্ন করা উচিত নয়—“আমরা কতজন রোগীকে চিকিৎসা দিলাম?”

আরও একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন—

“মানুষকে সুস্থ থাকতে এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে আমরা কতটা সাহায্য করতে পারলাম?”

কারণ একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু অসুস্থতার চিকিৎসা নয়; মানুষকে আরও সচেতনভাবে নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করার সুযোগ করে দেওয়াও।

হাসপাতালের কাজ রোগ সারানো—কিন্তু তার দায়িত্বের পরিধি রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করা এবং সুস্থ থাকার পথ দেখানো পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম

মন্তব্য করুন