
নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক মোড়ের নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের জমির সীমানা নিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে মালিকপক্ষের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। জমির মালিকানা ও দাগ-সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে ১৪২৫ নম্বর দাগের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে ওই দাগের জমি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের পরিধি ও শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিট পিটিশন নং ১৪৬১০/২০২৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারির পাশাপাশি ৭ অক্টোবর দাখিল করা আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আবেদনকারীর পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হাসান আবদুল কাইয়ুম।
মার্কেটের জমিটি কোন দাগে অবস্থিত, তা নিয়েই সিডিএ ও মালিকপক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। মালিকপক্ষের দাবি, মার্কেটের ৩ দশমিক ৫০ শতক জমি ১৪২৫ নম্বর দাগের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, সিডিএর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসানের দাবি, মার্কেটটি ১৪৬০ নম্বর দাগে অবস্থিত এবং সিডিএর অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে পড়েছে।
সিডিএর উচ্ছেদ উদ্যোগ, পুনঃপরিমাপের দাবি
ব্রিজঘাট থেকে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ১৫০ ফুট করে জমি নিজেদের বলে দাবি করে আসছে সিডিএ। সংস্থাটির দাবি, মইজ্জ্যারটেক মোড়ের নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের একটি অংশ তাদের জমির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে সম্প্রতি মার্কেটটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মালিকপক্ষের অনুরোধে জমিটি পুনরায় সার্ভেয়ার দিয়ে পরিমাপ অথবা ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর সেদিনের অভিযান স্থগিত রাখা হয় বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ভাষ্য। পরে জমির মালিকানা ও সীমানা নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন মার্কেটের মালিকানা দাবিদার মো. মিরাজুন্নবী মিরাজ।
মালিকপক্ষের দাবি, অবশিষ্ট জমিতে মার্কেট
নুরুন্নবী চেয়ারম্যানের বড় ছেলে মিরাজুন্নবীর দাবি, কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা মৌজার বি.এস. ৭৬৫ নম্বর নামজারি খতিয়ানের ১৪২৫ নম্বর দাগের অংশে ৩ দশমিক ৫০ শতক জমির ওপর তাঁদের তিনতলা মার্কেট ভবন নির্মিত হয়েছে। জমিটি আরএস ও বিএস রেকর্ড অনুযায়ী তাঁদের সম্পত্তি বলে দাবি করেন তিনি।
গত ৭ অক্টোবর সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে মিরাজুন্নবী উল্লেখ করেন, ১৪২৫ নম্বর দাগের মোট ৬ শতক জমি তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এলএ মামলা নম্বর ১৫/৩০৫-২০০৬-এর মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়। তাঁর দাবি, অধিগ্রহণের পর ৩ দশমিক ৫০ শতক জমি অবশিষ্ট থাকে এবং ওই জমির ওপর নির্মিত ভবন দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের দখলে রয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৮ সালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পত্রের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট জমির সীমানা নির্ধারণ ও চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত নথি, দলিল, নামজারি খতিয়ান এবং ভবন নির্মাণের অনুমোদনের কপিও আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সিডিএ বলছে, মার্কেট ১৪৬০ দাগে, মালিকপক্ষ বলছে ১৪২৫ দাগে
সিডিএর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান বলেন, “মইজ্জ্যারটেক মোড় হতে ব্রিজঘাট বাজারে আসতেই মোড়ের মুখের দুপাশে দেড়শ ফুট জমি সিডিএর। মইজ্জ্যারটেকে বাকি অভিযান দ্রুত পরিচালনা করা হবে। নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটটি ১৪৬০ নম্বর দাগে অবস্থিত। তারা হাইকোর্টে ১৪২৫ নম্বর দাগের বিষয়ে রিট করেছেন। কিন্তু মার্কেটটি ১৪২৫ নম্বর দাগে পড়েনি। অফিশিয়ালি অনুমতি পেলে আমরা দ্রুত অভিযান পরিচালনা করব।”
অন্যদিকে, মালিকপক্ষের দাবি, মার্কেটটি ১৪২৫ নম্বর দাগেই অবস্থিত। জমি পরিমাপ করা সার্ভেয়ারও একই দাগের কথা বলেছেন বলে দাবি তাঁদের। ফলে সিডিএর অধিগ্রহণসংক্রান্ত নথি, মালিকপক্ষের দলিল এবং জরিপের তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
আগেও একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান
কর্ণফুলী উপজেলার পুরাতন ব্রিজঘাট, ব্রিজঘাট কাঁচাবাজার, সৈন্যরটেক, খুদ্যেরটেক, আজিমপাড়া ও মইজ্জ্যারটেক এলাকায় গত কয়েক বছরে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে সিডিএ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে ব্রিজঘাট কাঁচাবাজার ও আশপাশের স্থাপনায় অভিযান চালানো হয়। একই মাসে ব্রিজঘাট বাজার থেকে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত এলাকাতেও অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই বছরের আগস্টে পুরাতন ব্রিজঘাটের কয়লার মাঠ ও সড়কের পাশের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। ২০২৪ সালে পুরাতন ব্রিজঘাট থেকে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত এলাকায় আবারও অভিযান চলে। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রিজঘাট, সৈন্যরটেক, খুদ্যেরটেক, আজিমপাড়া ও মইজ্জ্যারটেক এলাকায় বড় পরিসরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সিডিএ।
মালিকপক্ষের দাবি, এসব অভিযানের সময় নুরুন্নবী চেয়ারম্যান মার্কেটের ৩ দশমিক ৫০ শতক জমিকে সিডিএর সম্পত্তি হিসেবে দাবি করার তথ্য তাঁদের জানা ছিল না। তবে সম্প্রতি মার্কেটের একটি অংশ নিজেদের জমিতে পড়েছে বলে সিডিএ দাবি করায় বিরোধটি নতুন করে সামনে এসেছে।
উচ্ছেদের ক্ষেত্রে কী বলে আইন
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮-এ কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট ক্ষমতা ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। আইনের ২২ ও ৫০ ধারায় ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অননুমোদিত নির্মাণ বা স্থাপনা অপসারণের বিষয়ে বিধান রয়েছে। তবে কোনো জমি বা স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতার আইনগত ভিত্তি, জমির অবস্থান এবং প্রযোজ্য পদ্ধতি যাচাই করা প্রয়োজন।
জমির মালিকানা বা সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকলে অধিগ্রহণের গেজেট, এলএ মামলার নথি, খতিয়ান, মৌজা নকশা, দলিল এবং জরিপের তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে আইনসম্মত পদ্ধতিতে পুনঃপরিমাপের মাধ্যমে বিতর্কিত জমির অবস্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে।
আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ থাকলে তার সুনির্দিষ্ট পরিধি ও শর্ত মেনে চলতে হয়। তবে আদেশের আওতা যাচাই না করে পুরো মার্কেটের সব ধরনের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের মূল আদেশের ভাষা এবং সংশ্লিষ্ট জমির দাগ-সীমানার বিবরণই গুরুত্বপূর্ণ।
মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণই এখন মূল প্রশ্ন
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, মইজ্জ্যারটেক মোড়ের ওই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে নুরুন্নবী চেয়ারম্যানের মার্কেট রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের ভোগদখল বা স্থানীয় পরিচিতি একাই জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণ করে না।
সিডিএর দাবি করা অধিগ্রহণ করা জমি এবং মালিকপক্ষের দাবি করা ৩ দশমিক ৫০ শতক জমির অবস্থান একই কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও জরিপের তথ্য যাচাই প্রয়োজন। বিশেষ করে ১৪২৫ ও ১৪৬০ নম্বর দাগের অবস্থান এবং সিডিএর নথিতে উল্লেখ করা অধিগ্রহণ করা জমির সঙ্গে মার্কেটের সীমানার সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
হাইকোর্টের আদেশের পর জমির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদালতের নির্দেশনা, অধিগ্রহণের নথি এবং উভয় পক্ষের উপস্থাপিত দলিলপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।









