বন্ধুর ডাকে নিচে নেমে লাশ হয়ে ফিরলো তাহসিফ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার কথা বলে বাসা থেকে নিচে নেমেছিলেন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তাহসিফের বাবা।

তাহসিফ আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন কি না, জানতে চাইলে কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল বলেন, ‘না, আত্মহত্যার তো প্রশ্নই আসে না। সে অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ। আর সে একজন কমিশনড অফিসার, অনেক কষ্ট করে তাকে এটা অর্জন করতে হয়েছে। সে বিভিন্ন কোর্স করেছে, তারপরে ফ্লাইংয়েও ভালো। এমন একজন অফিসার, এরকম কোনও ব্যাপার ছিল না।’

বাবা হিসেবে ছেলের সঙ্গে খুব ‘ফ্রেন্ডলি’ সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে অনেক কিছু সে শেয়ার করতো। আমাকে প্রায়ই বলতো—বাবা, আমি তো কোথাও কোনও অ্যাফেয়ার্সে অ্যাড হতে পারি নাই। আমার জন্য মেয়ে তোমরা দেখবা।’

চাকরি হারানোর পর তা নিয়ে তাহসিফের মন খারাপ ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক। একটু খারাপ লাগতেই পারে। তবে সেজন্য কোনও সমস্যা ছিল না।’

তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহের কারণ জানতে চাইলে তার বাবা বলেন, ‘হ্যাঁ, তাকে হত্যা করা হয়েছে। কেননা তাকে নিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছে, আরেক এলাকায়। এর মানে তো তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে আমি সাসপেক্ট করি।’

তাহসিফ কীভাবে নিখোঁজ হলেন, এমন প্রশ্নে এনায়েতুল হেলাল বলেন, ‘২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পরে ওর এক বন্ধু এসে ডেকেছে। ডাকলে আম্মাকে বলছে যে আম্মু, আমি একটু নিচে থেকে কথা বলে আসি। এরপর থেকে সে আর বাসায় ফেরেনি। ২৮ তারিখ বিকালে ওর লাশ পাওয়া গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দ্বীপ নামে তাহসিফের এক বন্ধু এসে ডেকেছিল। পরে তাহসিফ তার মাকে বলেছিল, আমি নিচ থেকে একটু কথা বলে আসি। কিন্তু তারপরে আর সে ফেরেনি। সবশেষ রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সে একটি ভয়েস মেসেজ দিয়েছিল দ্রুত যে, আমি আসতেছি।’

তাহসিফের স্বভাব সম্পর্কে তার বাবা বলেন, ‘সে খুবই পোলাইট এবং সোশ্যাল একজন মানুষ। কারো সঙ্গে গ্যাঞ্জাম-ফ্যাসাদ বা কোনও ঝামেলা নাই। এজন্য আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’

কয়েকটি গণমাধ্যমে এর আগে কে এম এনায়েতুল হেলালের বরাত দিয়ে তাহসিফকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, তাকে হুমকি দিয়েছে, এরকম কথা আমি বলিনি। এটাই একটা মুশকিল, আমাদের দেশে যে কথাবার্তার অনেক শাখাপ্রশাখা গজায়। আমি এমন কিছু বলি নাই যে তাকে হুমকি দিয়েছে।’

তাহসিফ চাকরি হারানোর পর কী করতেন, জানতে চাইলে তার বাবা বলেন, ‘তাহসিফ কয়েকদিন আগে মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করে বেশ ইনজুরি হয় বলে বিশ্রামে ছিল। এর আগে সে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কাজ করে, নেত্র নিউজের সঙ্গেও ছিল। সবশেষ ভার্গো টোবাকোর অ্যাডমিন অ্যান্ড সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিল।’

তাহসিফের সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু বুঝিয়ে বলতে পারবো না। কারণ সে তো একটা ভালো ছেলে। মায়ের সঙ্গে শপিং টপিং করে, আমার জন্য শপিং করে করেছে। সে তার আম্মুকে স্বাভাবিকভাবেই বলেই নামলো যে আম্মু, একটু বন্ধু আসছে। আমি কথা বলে আসছি। এখানে তো আত্মহত্যার প্রশ্ন আসছে না।’

এদিকে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর তাহসিফের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও মরদেহ নিতে স্বজনদের উপস্থিতি নিয়ে জটিলতার কথা জানান মর্গসংশ্লিষ্ট সূত্র ও মরদেহ নিয়ে আসা নৌ পুলিশের এক সদস্য।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে মরদেহের সঙ্গে একজন স্বজন হাসপাতালে এসেছিলেন। পরে তিনি চলে যান।

যে লাশবাহী গাড়িতে করে সাবেক এই কর্মকর্তার মরদেহ আনা হয়, সেই গাড়ির চালক সামিউল বলেন, ‘আমাকে মালিক বলেছে এখানে মরদেহ নিয়ে আসতে। এখন ভেতরের কাজ শেষে মরদেহ আবার গাড়িতে তোলা হয়েছে, উত্তরায় নিয়ে যাব। এর বেশি জানি না। আমার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির পরিবারের কেউ নেই।’ পরে মরদেহ নেওয়া হয় উত্তরার বাসায়।

তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্নের পর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. নাশাত জাবীন সাংবাদিকদের জানান, ‘তাহসিফের লিভার, কিডনি, পাকস্থলি, ব্লাডসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ প্রোফাইলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই সব রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

এদিকে ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার জানান, তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নৌ পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর দেওয়া হয়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তার পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা ছিল। হাতে থাকা ঘড়ি ও পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

মন্তব্য করুন