
নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উদ্যোগে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে সরকার।
নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ২ দিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সফর করে ঢাকা ফেরার পূর্বে বৃহস্পতিবার মেয়রের হাতে কমিটির প্রজ্ঞাপন হস্তান্তর করেন মন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব আশফিকুন নাহারের সই করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এছাড়া কমিটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ওয়াসা, সিডিএ, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার উন্নয়ন, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ট্রাফিক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রকৌশল, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা, বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকরাও।
এছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এবং সিটি কর্পোরেশনের খাল ও জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
কমিটির কার্যপরিধিতে ৬টি বিষয় অন্তর্ভূক্ত করেছে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুসারে এই কমিটি চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল খাল ও পানি নিষ্কাশন নালাসমূহ সারা বছর সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় সাধন করবেন; মহানগরীর জলাবদ্ধতাসহ জনস্বার্থে জনগুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কাজের সমন্বয় সাধন করবেন; গঠিত কমিটি প্রয়োজনে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কাজের দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন তদারকি করবেন; কমিটি প্রয়োজনে সময়ে সময়ে সভা আহবানপূর্বক উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কাজের অগ্রগতি তদারকি ও সমন্বয় করবেন; চট্টগ্রাম মহানগরীর জনস্বার্থে যে কোনো বিষয় সময়ে সময়ে সরকারকে সুপারিশ করবেন এবং প্রয়োজনে কমিটি বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থার সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবেন।
এর আগে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডারসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে মহেশ রেগুলেটর ও মহেশখাল কুমার রেগুলেটর এলাকা ঘুরে দেখেন। পরে বারেক বিল্ডিং মোড়, কোতোয়ালী মোড়, মেরিন ড্রাইভ, মরিয়ম বিবি, কলাবাগিচা, টেকপাড়া, চাক্তাই ও রাজাখালী খাল এলাকার চলমান কাজ পরিদর্শন করেন। এছাড়া শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক হয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোডের মোড়, চাক্তাই ডাইভারশন খাল, চন্দনপুরা, চকবাজার ফুলতলা ব্রিজ, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও প্রবর্তক মোড় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমও ঘুরে দেখেন তিনি।
পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন দ্রুত চট্টগ্রামে এসে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে। আমি গতকাল রাত থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি। যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবে তেমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখিনি।”
তিনি আরও বলেন, “হঠাৎ ৮০ থেকে ৯০ মিলিমিটার ভারী বৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবেই পানি সরতে কিছুটা সময় লাগে। এটিকে জলাবদ্ধতা বলা যাবে না, এটি সাময়িক জলজট। প্রকৃত জলাবদ্ধতা তখনই বলা যায়, যখন তিন-চার দিন পানি নেমে না যায়।”
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩৬টি খালের মধ্যে কয়েকটি খালে উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় পানি জমেছিল। বিশেষ করে রিটেইনিং ওয়াল ও অস্থায়ী প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তবে সিটি কর্পোরেশন, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করেছে।
তিনি জানান, বর্ষাকালের আগে আপাতত ড্রেন ও খাল উন্নয়নকাজ সীমিত রাখা এবং চলমান কাজের ব্যারিকেড ও রিটেনিং ওয়াল অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্ষা শেষে আবার উন্নয়নকাজ শুরু হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ উন্নতি হয়েছে। চলমান প্রকল্পের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হলে স্থায়ী সমাধান আরও দৃশ্যমান হবে। আগামী বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামবাসীকে ২০২৪ সালের পরিস্থিতিতে ফিরতে হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের নকশা অনুযায়ী খাল, সুইসগেট ও নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন করা হচ্ছে। স্বাভাবিক বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হবে না, যদিও অতিভারী বর্ষণে কয়েক ঘণ্টার জলজট তৈরি হতে পারে।”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, চলমান খাল সংস্কার কাজের কারণে সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প নগরবাসীর উপকারে আসবে। পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি পয়েন্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি ও ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, জামালখানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কাজ এখনো চলমান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে আবারও চট্টগ্রাম সফর করে খাল সংস্কার কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করবেন বলেও জানান তিনি।
পরিদর্শনের শেষে প্রতিমন্ত্রী ঢাকায় ফেরার আগে মেয়রকে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের যে নির্দেশনা জানান তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে সভা করেন মেয়র।
সভায় মেয়র বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সবগুলো সেবা সংস্থার সহায়তায় গত বছরে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে। ৩০ বছরের একটি সমস্যা সমাধানে আমরা সিডিএ, সেনাবাহিনী, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করছি। সরকার কমিটি গঠন করে দিয়েছে। আমরা সবাই এক সাথে কাজ করলে ইনশাল্লাহ আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করি।









