
নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেছেন, জনগণের ভোটাধিকার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত শ্রমিক জনতা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, সরকার জনগণের রায়কে সম্মান না করলে দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান থাকবে।
তিনি আজ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ইউনিট প্রতিনিধি সম্মেলন ২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান’র সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহাজাহান, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া ও মুহাম্মদ ইসহাক, নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস ও অধ্যক্ষ খায়রুল বাশার।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দেশের কল্যাণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর বিধান ও ইসলামী আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই। মানব রচিত মতবাদ দিয়ে জনগণের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দেশের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সংগঠিত শক্তি গড়ে তুলতে হবে। ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে আদর্শিক ও নৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। তিনি দাবি করেন, শ্রমিকদের সমর্থন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটকে আরও জনবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব করা প্রয়োজন। বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তবে সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা-দুটিই জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত অবস্থান। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সরকার ও বিরোধী পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাওলানা মুহাম্মদ শাহাজাহান শ্রমিক সমাজকে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আদর্শিক আন্দোলনে সংখ্যার চেয়ে মানসম্পন্ন ও যোগ্য কর্মী গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রত্যেক কর্মীকে আত্মগঠনের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আত্মগঠনের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, কিয়ামুল লাইল, জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা এবং ধৈর্য ধারণের শিক্ষা অনুসরণ করতে হবে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে শ্রমিক নেতাকর্মীদের সমাজে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, সৎ, দক্ষ ও আদর্শিক নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমেই শ্রমিক সমাজের কল্যাণ এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে শ্রমিক ময়দানে কর্মরত সকল নেতাকর্মীকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের ধারাবাহিক চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং শতাধিক শ্রমিকের আত্মত্যাগের পরও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে শ্রমিকদের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রাখা হয়নি। একই সঙ্গে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোও প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ০.০৬ শতাংশ, যা বর্তমানে ০.০৪ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের শ্রমিকদের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার দাবি জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা হলেও চার সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার কম নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য জীবনযাপন নিশ্চিত করতে মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন করতে হবে।
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি ভোটের পূর্বে দেশে মদিনার শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল। আমরা সেই কথা তাদেরকে স্মরণ করে দিতে চাই। মদিনার ইসলাম কায়েম করতে হলে রাসূল (সা.) এর সুন্নাহকে মনে রাখতে হবে এবং খেলাফতে রাশেদার সুন্নাহকে ধারণ করতে হবে। হাদিসে এসেছে ‘ফিসুন্নাতি ওয়া সুন্নাতিল খুলাফায়ির রাশিদিনাল মাহদিয়্যিন’। হেদায়েত পেতে হলে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে হলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহর মধ্যে এবং খেলাফতে রাশেদার সুন্নাহর মধ্যেই হেদায়েত খুঁজতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারী আপনাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। তাদের কথায় চললে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। ভুলভাল বলবেন। নিজের মর্যাদা হানি করবেন। দেশ ও জনগণকে লজ্জিত করবেন। আমরা এইরকম অবস্থা চাই না। আপনি ১৮ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের পরিপূর্ণ সীমার প্রধানমন্ত্রী। কাজেই বাংলাদেশের সকল মানুষের মর্যাদা, দেশের মর্যাদা রক্ষা করা হচ্ছে আপনার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে সর্বত্র আবার ফ্যাসিবাদের দোসরদেরকে প্রতিষ্ঠা করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সেই বিষয়েও আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে এস এম লুৎফর রহমান বলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর নগর হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরকে লুটপাটের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল এবং বর্তমানে টেন্ডার ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যা শ্রমিক-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
তিনি বিপিসির কেন্দ্রীয় কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেন এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম থেকেই দেশব্যাপী জাগরণ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
নগর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী’র সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন নগর ফেডারেশনের সহ-সভাপতি নজির হোসেন ও মকবুল আহমেদ ভূঁইয়া।
এতে উপস্থিত ছিলেন বিআরআইএলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মজুমদার, নগর সহ-সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শিহাব উল্লাহ ও অধ্যক্ষ আসাদ উল্লাহ আদিল, সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুন্নবী, দপ্তর সম্পাদক স ম শামীম, প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহীম মানিক, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম ও পাঠাগার সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।









