
মোঃ আবদুল বাতেন: চব্বিশের জুলাই-আগস্ট বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব জলবিভাজিকা। বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তরুণ সমাজ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। এই বিপ্লব আমাদের শুধু রাজনৈতিক মুক্তি দেয়নি, বরং সমাজ ও অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে এক নতুন বার্তা দিয়েছে। এখন সময় এসেছে সেই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি আত্মনির্ভরশীল ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের। আর এই বিনির্মাণের মূল কারিগর হলো আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার একমাত্র চাবিকাঠি হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET)।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতির সুফল ভোগের এক সুবর্ণ যুগে অবস্থান করছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সনাতন ও তত্ত্বীয় উচ্চশিক্ষা সাধারণ তরুণদের মাঝে ডিগ্রিধারী বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও কর্মসংস্থানের বাজারে তাদের উপযোগী দক্ষতার অভাব স্পষ্ট। নৈতিক অবক্ষয়, মাদক এবং হতাশার অন্যতম মূল কারণ এই বেকারত্ব। জুলাই-আগস্টের বিপ্লবীরা যে বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হলে তরুণদের এই বিশাল শক্তিকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে।
কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ: বর্তমান সময়ের বড় তাগিদ
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে যদি আমরা হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বৃত্ত থেকে বের হতে চাই, তবে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কারিগরি শিক্ষা তরুণদের কেবল কর্মসংস্থানই দেয় না, বরং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলে। কারিগরি শিক্ষার একজন ছাত্র ও দীর্ঘদিনের পেশাজীবী হিসেবে আমি মনে করি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থীদের হাতে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সনদ তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বর্তমানে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষও শুধু প্রশিক্ষণ প্রদানের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশিক্ষিতদের বাস্তব কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গুরুত্বের সাথে তাগাদা দিচ্ছে।
তবে এই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত ধারার বাইরে এসে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। সাধারণত আমরা ভাবি, পাস করা শিক্ষার্থীদের সরাসরি কোনো বিদ্যমান শিল্প-কারখানায় পাঠিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কোনো কারখানায় যদি নতুন কর্মীর চাহিদা না থাকে, তবে সেখানে বাড়তি জনবল নিয়োগ দেওয়া ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জোর করে বা অনুরোধের ভিত্তিতে কোনো টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয়।
বিকল্প ভাবনা: শিক্ষানবিশি প্রতিষ্ঠান (Apprenticeship Institute) মডেল
শিল্প-কারখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে এর একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে ‘শিক্ষানবিশি প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলা। এটি হবে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সদ্য সনদপ্রাপ্ত কারিগরি গ্র্যাজুয়েটদের স্বাগত জানিয়ে বলা হবে—”এসো, প্রথমে চাকরি করো এবং সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা নাও।”
এই মডেলটির মূল লক্ষ্য হবে দ্বিমুখী:
১. তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান ও অভিজ্ঞতা: শিক্ষার্থীরা পাস করার পর বেকার বসে না থেকে সরাসরি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে যোগ দেবে এবং নিয়মিত কাজের মাধ্যমে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করবে।
২. উদ্যোক্তা তৈরির চারণভূমি: এই শিক্ষানবিশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি তারা একটি ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হয়, ক্লায়েন্ট কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় এবং বাজারের চাহিদা কেমন—সেসব বিষয়ে বাস্তবমুখী ব্যবসায়িক ধারণা (Business Concept) লাভ করবে।
নির্দিষ্ট সময় পর এই তরুণরাই আর পাঁচটা চাকরির পেছনে ছুটবে না, বরং নিজেরাই একেকজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে এবং আরও দশজন তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ ও আমাদের প্রয়াস
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার প্রসারে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। একটি বেসরকারি পলিটেকনিকের অধ্যক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে তরুণদের সম্ভাবনাকে দেখেছি। আমরা কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা দিচ্ছি না, বরং হ্যান্ডস-অন ট্রেনিং বা বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের উপযোগী করে গড়ে তুলছি। আমাদের লক্ষ্য তরুণদের মধ্যে এই শিক্ষানবিশি ধারণার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করা, যেন তারা স্বনির্ভর হতে পারে।
দক্ষতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান বা ইঞ্জিনিয়ার যখন কাজের নিশ্চয়তা পায় এবং স্বাবলম্বী হয়, তখন সে কখনো চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয় না, কারণ তার হাতে থাকে সৃজনশীলতার শক্তি ও জীবিকার নিশ্চয়তা।
উপসংহার
জুলাই-আগস্টের শহীদ ও বিপ্লবীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি তরুণকে দক্ষ ও কর্মসংস্থানযুক্ত হাতে রূপান্তর করতে হবে। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সাথে এই শিক্ষানবিশি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন মডেলের সমন্বয় ঘটাতে পারলে তরুণ প্রজন্ম দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হবে। নৈতিক অবক্ষয়ের এই যুগসন্ধিক্ষণে একটি আদর্শ, আত্মনির্ভরশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে এটিই হোক আমাদের রোডম্যাপ।
অেধ্যক্ষ (লিয়েন), গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং সাবেক অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসহাব সিরাজ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম।
সভাপতি, মীপস্ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজি পরিচালনা পর্ষদ।
প্রতিষ্টাতা অধ্যক্ষ রাউজান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, আর আই টি।
সার্টিফাইড ট্রেইনার এন্ড ইন্ডাস্ট্রি এসেসর, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কতৃপক্ষ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আওতাধীন, ঢাকা।
সার্টিফাইড কম্পিটেন্সি এসেসের লেভেল -০৪, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা।








