বন্যার পানি নেমে গেলেও স্বাস্থ্য সংকটে চট্টগ্রাম

নিউজগর্ডেন ডেস্ক: বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলেও চট্টগ্রাম বিভাগে এখন দেখা দিয়েছে নতুন স্বাস্থ্য সংকট। বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ, সাপের কামড় এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে ছিল, সেখানে দূষিত পানি, ভেঙ্গে পড়া পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পানির সংকট জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসক, মেডিক্যাল টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা হলেও সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে সাতকানিয়া। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ পানিবাহিত রোগ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। এছাড়া শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে পানিশূন্যতার সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগও বাড়ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অমিত দে জানান, বন্যার পর অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে দূষিত নলকূপ বা খোলা উৎসের পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলেই ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, হাসপাতালে স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বাঁশখালী উপজেলাতেও। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজমা আক্তার জানান, হাসপাতালে প্রতিদিন যে রোগীরা আসছেন তাদের ৩০ শতাংশেরও বেশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। অনেকের মধ্যে বমি, জ্বর, পেটব্যথা ও পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা না গেলে আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

চট্টগ্রাম নগরীতেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চন্দ্রনগরের বাবুলের কলোনিতে গত দুই দিনে অন্তত ১৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সাউদার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে শুক্রবার দুপুরে আবদুল মতিন (৭৫) নামের এক বৃদ্ধকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয় বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রাতুল হালদার। বর্তমানে ওই এলাকার আরও কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডায়রিয়া ছাড়াও চর্মরোগ, সাপের কামড় এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল এবং নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১২ জন। এছাড়া সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫ জন। সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে বোয়ালখালী উপজেলায় ২৬টি, বাঁশখালীতে ১৯টি এবং পটিয়ায় ১৮টি। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর সাপ লোকালয়ে চলে আসায় এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, উপজেলার হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ১০০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ৫০ হাজারের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত পাঁচটি জেলায় ৫১৬টি মেডিক্যাল টিম মাঠপর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগীদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, বর্ষাকাল ও বন্যার পর জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মে মাসে যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৭ জন, সেখানে চলতি মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ১৭৪ ছাড়িয়েছে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যুও হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, দুর্বলতা ও মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। তবে কিছু রোগীর মধ্যে রক্তক্ষরণ, নিম্ন রক্তচাপ, বমি ও ডায়রিয়ার মতো জটিল উপসর্গও দেখা যাচ্ছে। তিনি দ্রুত পরীক্ষা এবং চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার পর প্রথম দুই থেকে চার সপ্তাহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই সব ধরনের খাবার ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া, ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পানি পান করা, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করে এডিস মশার প্রজনন রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তত ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার অগভীর নলকূপ দূষিত হয়ে পড়েছে, ফলে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ৪ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য ওষুধ পর্যাপ্ত রয়েছে। তিনি বলেন, বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হলে রোগের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সাধারণ মানুষকে জ্বর, পাতলা পায়খানা, অতিরিক্ত বমি, তীব্র দুর্বলতা, রক্তক্ষরণ কিংবা সাপের কামড়ের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন