রিদুয়ানুল ইসলাম এখন কর্ণফুলীর ইউএনও!

নিউজগর্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রামের প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাউজানের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রিদুয়ানুল ইসলামকে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে পদায়নের ঘটনা। গত ১৮ জুন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে তার এ পদায়ন অনুমোদন দেওয়া হয়।

তবে এ পদায়নকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাউজানে দায়িত্ব পালনকালে মো. রিদুয়ানুল ইসলাম তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্থানীয় মানুষের জমি-জমা, খাসজমি বন্দোবস্ত, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাণ রক্ষার্থে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের আইএসপিআরের তালিকায় রাউজানের সাবেক ইউএনও অং যাই মারমার নাম ছিল ৩২ নম্বরে। আর ৩৩ নম্বরে ছিলেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রিদুয়ানুল ইসলাম।

এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি গোপন তালিকায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠা ৭৮ কর্মকর্তার মধ্যে রিদুয়ানুল ইসলামের নাম ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, রিদুয়ানুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ফজলে করিমের প্রভাব খাটিয়ে তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি করতেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিতেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাউজানে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি প্রটোকল উপেক্ষা করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরকার পরিবর্তনের পর রিদুয়ানুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিব এবং সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে গোপনীয় শাখা, সংস্থাপন ও হিসাব শাখার দায়িত্বে যোগ দেন। কিছুদিন আড়ালে থাকার পর কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তার পদায়নের মাধ্যমে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে কর্মচারী শাহাজাহানকে কেন্দ্র করে রিদুয়ানুল ইসলাম একটি ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কার্যালয়ের কয়েকটি সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের নাম ব্যবহার করে পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধা করে দেওয়া হতো। এমনকি নিয়োগ, সার্ভেয়ার ও তহসিলদার বদলিসহ বিভিন্ন কাজে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তার ব্যাংক হিসাব যাচাই করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, গোপনীয় ও সংস্থাপন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজের প্রভাব খাটিয়ে নিয়েছিলেন রিদুয়ানুল ইসলাম। তাদের দাবি, কার্যালয়ের বিভিন্ন কাজে তার অনুমোদন বা সন্তুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

রাউজানের হাবিব রানা বলেন, ‘সাবেক এসিল্যান্ড মো. রিদুয়ানুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি ও রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নির্দেশে নিরীহ মানুষের জায়গা-জমি খাস দেখিয়ে রাউজানে ২২৩টি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর নির্মাণ করেছিলেন।’

রাউজানের রুবেল অভিযোগ করেন, ‘আমাদের ৩৭ শতাংশ জায়গা ছিল। সামনের অংশে দোকানপাট ও ঘর ছিল। হঠাৎ একদিন এসিল্যান্ড রিদুয়ানুল ইসলাম এসে বলেন, দোকান ভেঙে এখানে মসজিদ হবে। কয়েক দিন পর আমাদের মতামত না নিয়েই দোকান ও ঘর ভেঙে দেওয়া হয়। পরে সেখানে মডেল মসজিদ নির্মাণ করা হয়। জায়গা অধিগ্রহণ না করেই এমনটি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।’

রাউজানের আবদুল বারেক বলেন, ‘আমি জীবিত থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে আমাকে মৃত দেখিয়ে আমার ভাবি জরিনা বেগম আমার সাড়ে ৪ গণ্ডা, অর্থাৎ প্রায় ৯ শতাংশ সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন। বিষয়টি আমি তৎকালীন এসিল্যান্ড রিদুয়ানুল ইসলামকে জানিয়েছিলাম এবং নামজারি বাতিলের আবেদন করেছিলাম। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাউজানের সাবেক ইউএনও আবদুস সামাদ সিকদার ও সাবেক এসিল্যান্ড রিদুয়ানুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।

২০২৩ সালের ৫ জুন রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর মেজ ভাই এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য প্রয়াত এ বি এম ফজলে রাব্বী চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গহিরা বঙ আলী চৌধুরী জামে মসজিদে খতমে কোরআন, দোয়া মাহফিল ও পুষ্পমাল্য অর্পণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান।

এদিকে বিএনপি-জামায়াতসহ স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির নেতাকর্মীদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে কেন কর্ণফুলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল উপজেলায় ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হলো?

তাদের দাবি, প্রশাসনের ভেতরে এখনো আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই না করা হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আমি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন ও মো. রিদুয়ানুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে কথা বলতে নারাজ।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘আমার এলাকায় আওয়ামী লীগের কোনো দোসর চাই না। বিভাগীয় কমিশনারের উচিত ছিল বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

এদিকে দ্রুত রিদুয়ানুল ইসলামের পদায়ন প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অভিযোগগুলো তদন্ত না করে তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল রাখা হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

 

মন্তব্য করুন