প্রশাসনের এক আদর্শ মুখ: মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা

মুহাম্মদ টিপু সুলতান: বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মনিষ্ঠ, সাহসী ও দূরদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা একজন দেশপ্রেমিক, মেধাবী ও মানবিক মূল্যবোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রশাসক! তিনি অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (BEZA) গভর্নিং বোর্ডের সদস্য এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (CDA) সম্মানিত বোর্ড সদস্য হিসেবেও মনোনীত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বখ্তপুর গ্রামের খ্যাতনামা আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা একাধারে উচ্চশিক্ষিত, নীতিবান, সাহসী ও সমাজসচেতন এক প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব! তাঁর পিতা সুলতান আহমদ ও মাতা ফিরোজা বেগমের আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় তিনি বেড়ে ওঠেন মানবিকতা, দেশপ্রেম ও ন্যায়ের পতাকাবাহী একজন যোগ্য সন্তান হিসেবে।

শৈশব থেকেই মেধা ও নেতৃত্বগুণের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই কৃতী ব্যক্তিত্ব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পর্বেই কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। ১৯৮৪ সালে জাহানপুর আমজাদ আলী আবদুল হাদী ইনস্টিটিউশন থেকে প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে অষ্টম শ্রেণিতে ফার্স্ট গ্রেডে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে চার বিষয়ে লেটার মার্কসসহ রেকর্ড নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেন।

পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬তম ব্যাচে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হয়ে বিএসএস (অনার্স) পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান এবং এমএসএস পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন, যা তাঁর প্রজ্ঞা, অধ্যবসায় ও একাগ্র সাধনার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পিএইচডি গবেষক হিসেবে উন্নয়ন প্রশাসন বিষয়ে গবেষণা করছেন।

মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI)-তে যোগদানের মাধ্যমে। পরে কুমিল্লায় অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)-এর সহকারী পরিচালক হিসেবে তিন বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২১তম বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হয়ে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কমিশনার হিসেবে সরকারী চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ তাঁকে একের পর এক উচ্চপদে উন্নীত করেছে।

তিনি নওগাঁ ও যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে; খুলনা, বরিশাল এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বরগুনা ও নোয়াখালী জেলার দুইটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে তাঁর কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (CDA) সচিব, বিয়াম ফাউন্ডেশন কক্সবাজার কেন্দ্রের পরিচালক, ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক হিসেবেও তিনি সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) এবং পরিচালক, স্থানীয় সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রশাসনিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষা উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। ফটিকছড়ির ইছাপুর বিএমসি কলেজ, চট্টগ্রামের শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইনস্টিটিউট, দিলওয়ারা জাহান মেমোরিয়াল কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রশাসন ও শিক্ষা ছাড়াও সাহিত্যে রয়েছে তাঁর প্রাঞ্জল উপস্থিতি। শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি জাতিকে উপহার দিয়েছেন প্রজ্ঞাপূর্ণ ও মানবিক চিন্তার অনন্য দৃষ্টান্ত, যা পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

তাঁর শৈশব থেকেই ছিল নেতৃত্বগুণের অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন—যা তাঁর সাহসিকতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের অবিচল নিদর্শন।

যদিও দীর্ঘ সময় তাঁর প্রজ্ঞা ও কর্মদক্ষতার পূর্ণ মূল্যায়ন হয়নি, তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রশাসনিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর সততা, দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্বগুণের যথার্থ স্বীকৃতি লাভ শুরু হয়।

আজ মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা একজন উন্নয়নমনস্ক, সৎ, ন্যায়ের পক্ষে অটল এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একজন আধুনিক প্রশাসক, যিনি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নযাত্রায় এক অপরিহার্য চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

আমরা মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি—তিনি যেন এই গুণীজনের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ, সাফল্যমণ্ডিত ও কল্যাণময় করে তোলেন। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব চিরকাল অক্ষয় ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক।

বর্তমান নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন; সাবেক অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (চট্টগ্রাম), পরিচালক (স্থানীয় সরকার) এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক, চট্টগ্রাম।

লেখক: সমাজ চিন্তক
Mobile: 01628749427

মন্তব্য করুন