গন্তব্যহীন শিক্ষা কোন কাজে আসবে না: ড. ইউনূস

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করেছে চবি। আজ বুধবার (১৪ মে) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত ৫ম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাঁকে এ ডিগ্রি প্রদান করেন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহইয়া আখতার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা শুরু করে প্রায় এক দশক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর আগে দুপুর ২টার দিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে উপস্থিত হন। এসময় তাঁকে অভ্যর্থনা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষকরা।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন সরকারের আরও চার উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার, ফারুক-ই-আজম, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, নূরজাহান বেগম এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। দেশের সর্ববৃহৎ এই সমাবর্তনে অংশ নিয়েছেন প্রায় ২৩ হাজার গ্র্যাজুয়েট। ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনার্স, মাস্টার্স এবং ২০১৪ থেকে
অনুষ্ঠান শুরু হয় দুপুর ১টায়। কিন্তু তার আগেই সমাবর্তনের উৎসব ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাস জুড়ে। প্রিয় আঙ্গিনায় উপস্থিত হাজারো গ্র্যাজুয়েট। দীর্ঘদিন পর বন্ধুদের দেখা পেয়ে উচ্ছ্বসিত তারা। কেউ সেলফি তুলছেন। কেউ ব্যস্ত আড্ডায়। কারও গল্পের সঙ্গী বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

প্রিয় শিক্ষার্থীদের একনজর দেখতে ক্যাস্পাসে এসেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও। দুইদিন আগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাস্পাস মুখর হয়ে ওঠে গ্রাজুয়েটদের পদচারণায়। মাথায় কালো টুপি, গায়ে গাউন। দল বেঁধে ছোটাছুটি করছেন প্রিয় আঙ্গিনাজুড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য বসানো হয়েছে ফটোবুথ। আর এসব বুথগুলো ঘিরে আছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে সমাবর্তনের মঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ, সমাজ বিজ্ঞান, সাইন্স, জীব বিজ্ঞান, জারুল তলা, ঝুপড়ি, শহীদ মিনার জিরো পয়েন্ট, দক্ষিণ ক্যাস্পাস, ফরেস্ট্রি ও ক্যাম্পাসের আকর্ষণীয় স্থানগুলো সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন গ্রাজুয়েটরা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করে কেউ চাকরিতে প্রবেশ করেছেন আবার কেউবা এখনও বেকারত্ব ঘুচানোর চেষ্টায় আছেন। তবে সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে চাকরি বা বেকারত্ব কোনো কিছুরই যেন ছাপ নেই। সবাই মেতেছেন আনন্দ উল্লাসে।
সমাবর্তন উপলেক্ষে ক্যাম্পাসে ঠাঁই পেয়েছে জুলাইয়ের শহীদেরা। তারা আছেন গ্রাফিতির প্রতিটি তুলির আঁচড়ে, ফেস্টুনের প্রতিটি বাক্যে, মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি স্মৃতিতে। তারা হলেন ইতিহাস বিভাগের দুই শহীদ শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন ও হৃদয় তরুয়া। তাদের সঙ্গে আছেন চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম এবং জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ।

সমাবর্তনে অংশ নিচ্ছেন ২০১১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯টি অনুষদের ২২ হাজার ৫৮৬ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৪২ জনকে পিএইচডি ও ৩৩ জনকে এমফিল ডিগ্রি দেওয়া হয়। এছাড়া ড. ইউনূসকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর পর নিজ ক্যাম্পাসে আসছেন প্রধান উপদেষ্টা। সর্বশেষ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ২০০৭ সালে সপরিবারে নিজের ক্যাম্পাসে এসেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
কালুরঘাটে বহুল প্রত্যাশিত কর্ণফুলী নদীর ওপর রেলসহ সড়ক সেতু নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। উদ্বোধন ঘোষণা করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কালুরঘাট ব্রিজে আমার অনেক স্মৃতি। এই সেতুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক।
আজ এখানে বোয়ালখালীর বাসিন্দাও উপস্থিত আছেন। কালুরঘাট সেতু তাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত। এটি তৈরি হয়ে গেলে চট্টগ্রামবাসীর বহু কষ্টের অবসান হবে’। এসময় সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন একটি কালুরঘাট সেতু নির্মাণ। এখন যে সেতুটি আছে, ১৯৩১ সালে সেটি নির্মাণ করা হয়েছিল। যদি এর মেয়াদকাল ৮০ বছরও ধরা হয়, তবে ২০১১ সালে এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

এদিকে দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী উৎফুল্ল। বৃহস্পতিবার (১৫ মে) সকাল ৯টায় কালুরঘাট সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে বোয়ালখালীর সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ ও বোয়ালখালী কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আনন্দ মিছিল বের করা হবে।
অন্তর্র্বতী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালে সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরুর কথা আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকৌশলী আবুল কালাম চৌধুরীকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, সেতু নির্মাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে সহজ শর্তে ৮১ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণ পাচ্ছে বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশি নয় হাজার ৫৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৭ টাকা হিসাবে)। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ৭২ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রমোশন ফ্যাসিলিটি (ইডিপিএস) তহবিল থেকে নয় কোটি এক লাখ ৮০ হাজার ডলার দেওয়া হবে।

সেতুর প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর ওপর বিদ্যমান রেল সেতুর ৭০ মিটার উজানে নতুন সেতু নির্মিত হবে। দুই পাশে দুই লেন করে চার লেনের সেতু তৈরি হবে। এক পাশে চলবে ট্রেন, অপর পাশে বাস-ট্রাকসহ সাধারণ যানবাহন চলবে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৭০০ মিটার। পানি থেকে সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার। ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৬ কিলোমিটার। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেতু দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন ২০ জোড়া ট্রেন এবং দিনে প্রায় ১৫ হাজার যানবাহন চলাচল করবে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যে সেতু নির্মাণের জন্য পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপর ডিজাইন চূড়ান্ত করা হবে। সব ঠিক থাকলে ২০৩০ সালে সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করবে।

কালুরঘাটে বহুল প্রত্যাশিত কর্ণফুলী নদীর ওপর রেলসহ সড়ক সেতু নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভিত্তিপ্রস্তরের স্মারক ফলক উন্মোচন করেন তিনি।

উদ্বোধন ঘোষণা করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কালুরঘাট ব্রিজে আমার অনেক স্মৃতি। এই সেতুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। আজ এখানে বোয়ালখালীর বাসিন্দাও উপস্থিত আছেন। কালুরঘাট সেতু তাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত। এটি তৈরি হয়ে গেলে চট্টগ্রামবাসীর বহু কষ্টের অবসান হবে’।

এসময় সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন একটি কালুরঘাট সেতু নির্মাণ। এখন যে সেতুটি আছে, ১৯৩১ সালে সেটি নির্মাণ করা হয়েছিল। যদি এর মেয়াদকাল ৮০ বছরও ধরা হয়, তবে ২০১১ সালে এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে আগের তুলনায় অর্ধেকে এবং ক্রমান্বয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

এসময় তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নানা উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতার কথা শোনেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

‘আমরা অনেক রকম থিওরিটিক্যাল আলোচনা করেছি, সেসব আর করতে চাই না, আমরা চাই জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে। কিন্তু সেটা একবারেই হবে না, তাই আমাদেরকে ক্রমান্বয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে,’ বলেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘এবছর যেহেতু বর্ষা মৌসুম ইতোমধ্যে এসে গেছে তাই এবার সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব হবে না। কিন্তু গত কয়েক মাসে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তাতে এবছর যদি আশানুরূপ ফল না আসে তাহলে তো সবকিছু মনে হবে জলে গেল’।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক অর্জনের কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা হচ্ছে খুবই জটিল সমস্যা। এই সমস্যা নিরসনের মাধ্যমে অন্যান্য শহর ও জেলা উৎসাহিত হবে, তাই চট্টগ্রামকে এই কাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে।

এই সমস্যা নিরসনে নিয়মিত তাগিদ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের যে সক্ষমতা রয়েছে অন্য অনেক শহরের সেই সক্ষমতা নেই। তাই চট্টগ্রামের সকল প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে’।

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, প্রধান উপদেষ্টার স্পেশাল এনভয় লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।

চট্টগ্রাম সওদাগরদের শহর উল্লেখ করে অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নৌকা নিয়ে, পালতোলা জাহাজ নিয়ে কে কোথায় চলে যাবে। এখানে ভিড়েছে।
আরবরা এসেছিল, পর্তুগিজরা এসেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে চাটগাঁর লোকই সওদাগরের বৃত্তি বেছে নিয়েছে।
তারা ব্যবসা চেনে। চাকরির কথা বললে, বলে চাকরি কেন করবে বোঝে না। আমাদের মা বাবারা দোকানে বসাই দেন। আমিও দোকানে বসেছি। তারা চিন্তা করে না চাকরি বলে একটা জিনিস আছে। দেশ বিদেশে যাবে ব্যবসা করবে। যার ছোট জাহাজ সে ছোট জাহাজ নিয়ে যাবে। ছোটবেলায় দেখেছি জাহাজ আসছে মাল ভর্তি হয়ে, বিশেষ করে ধান, চাল আনতো বার্মা থেকে। পাশের বাড়ির খালের মধ্যে দেখেছি। আমাদের রক্ত হলো সওদাগরের রক্ত। চট্টগ্রাম হলো এ সওদাগরের পীঠভূমি।

এদের ছেড়ে দিলে, এদের হাতে ছেড়ে দিলে দেখবে শুধু বাংলাদেশ না সারা দুনিয়াতে করে দেখাবে। নোয়াখালীর লোক, সিলেটের লোক। আজকে সিলেটের মানুষ ওই জাহাজে করে বিলেতে চলে গেছে। রান্না করেছে, আগুন দিয়েছে এই করতে করতে চলে গেছে। সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে গেছে। সেই আমলে যদি তারা এত দুনিয়াতে ছড়িয়ে যায় আজকে বন্দর ব্যবস্থাপনায় যারা যুক্ত হবে বাংলাদেশে চিন্তা করেন তারা কোথায় কোথায় যাবে। দুনিয়ার কোনো বন্দর রাখবে না যেখানে বাংলাদেশি নেই। টপ ক্লাস সার্ভিস তারা দেবে। সেটাই আমাদের ভবিষ্যৎ। যেটা আমাদের রক্তের ভেতরে আছে, ঐতিহ্যের ভেতরে আছে। আমরা যেন এটাকে অবহেলা না করি। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আমাদের বিশাল অর্থনীতি হবে যদি চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশাল হৃৎপিণ্ডে পরিণত করতে পারি। বন্দর ফ্যাসিলিটি দিলে বিস্তীর্ণ এলাকা দিলে যেকোনো ব্যবসায়ী এসে এখানে বিনিয়োগ করবে। তাকে অনুরোধ করে আনতে হবে না। তার নিজের টানে আসবে। আমরা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলেছি। সব কিছু দরকার। তার আগে আমাদের স্বপ্নটা দরকার। যেটা আমরা করবোই। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতবেগে পরিবর্তন হতে শুরু করবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ৫ নম্বর ইয়ার্ডে বন্দর কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা এ মন্তব্য করেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্ক্রিনে দেখছি চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি। আমাদের মতো দেশে, একটা বন্দর, কয়েকটা টার্মিনাল নিয়ে কথা বলছি। অনেক দেশের এ রকম ২০-৩০টা বন্দর, টার্মিনাল ভরে আছে বিশ্বমাপের, বিশ্ব সাইজের। সেদিকে তাকালে আমাদের খুব ক্ষীণ মনে হয়। এ বন্দর দিয়ে তো রোগী বেশি দিন টিকবে না। টেকানো যাবে না। কাজেই এটাকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্রমাগতভাবে এটাকে শক্তিশালী করতে হবে। একবার শক্তিশালী করে দিলেই হবে না। সেটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।

মাঝেমাঝে প্রশ্ন শুনি যে বিদেশিকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনারা ইন্ডিয়াতে স্বাস্থ্যের জন্য যান না! দলে দলে যান! যখন বন্ধ করে দিছে হাহাকার করছে কেন যেতে দিচ্ছে না। কাগজ উল্টালে দেখা যায় নেতারা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে, ব্যাংককে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে। কিন্তু বন্দর – না না এখানে আর কেউ আসতে পারবে না। ভাই আমাদের চিকিৎসা দরকার তো। এর চিকিৎসা দরকার। তাই বিদেশি ডাক্তার আনতে হবে তো। উপায় নাই আমাদের। সব থেকে সেরা চিকিৎসক এটার পেছনে দিতে হবে যাতে এটি বিরাট আকারে বানিয়ে নিতে পারি। এ হৃৎপিণ্ড ক্রমাগত মজবুত হবে, শক্তিশালী হবে ও বৃহত্তর হবে।

আমাদের বড় ডাক্তার দিয়ে কাজ করতে হবে। এতে আমাদের লাভ। একটা লাভ হলো এর পেছনে আমাদের কোনো টাকা-পয়সা খরচ হচ্ছে না। একটা মজার জিনিস- বিল্ড অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার। তোমরা বানাও রোজগার করো, এই মেয়াদের মধ্যে আমাদের দিয়ে দিতে হবে। কাজেই পয়সা বেচে গেল কাজটা হয়ে গেল। তারা যখন কাজে নামবে, তারা দুনিয়াতে শত শত পোর্ট পরিচালনা করে। তারা দুনিয়ার সেরা। যেকোনো বন্দরে যান তাদের মার্কা দেখবেন। তারা যখন বন্দরের দায়িত্ব নেয়, আমাদের মতো বানাবে না। এটা তাদের বন্দর। তাদের রোজগার করে টাকা তুলতে হবে। তারা আগে যেসব বন্দর বানিয়েছে তাদের সর্বশেষ প্রযুক্তি, সর্বশেষ অভিজ্ঞতা এখানে আনবে। যাতে টাকা তাড়াতাড়ি তুলতে পারি, বেশি টাকা উঠাতে পারি। তারা যন্ত্র বানিয়ে দিল, মেয়াদ শেষে আমরা চালাতে পারবো। আমাদের টাকা লাগলো না। আমাদের অভিজ্ঞতা লাগলো না। তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু হলো। আমরা প্রযুক্তির শেষ মাথা থেকে শুরু করলাম, উচ্চতম শীর্ষ থেকে শুরু করলাম। সেটুকুই আমরা পেলাম।

চাকরি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ওরা যে আসছে তারা কি তাদের দেশ থেকে লোকজন নিয়ে আসবে? বন্দর চালাতে হলে আমাদের লোকই চালাবে। এটা থেকে গত্যন্তর নেই। আমাদের লোকদের শিখিয়ে দিলে খুব সহজে শিখে নেবে। খরচ কম। ইউরোপ থেকে শ্রমিক এনে যদি আমাদের বন্দর চালাতে হয় সেই ব্যবসা লাটে উঠবে। বন্দর বড় হবে, ক্যাপাসিটি বড় হবে। প্রযুক্তি সত্ত্বেও আগে যেখানে একজন লোক লাগতো এখন বন্দর বড় হওয়ায় পাঁচজন লাগবে। আমি বলি, আজ সই করে দিলেও পাঁচ বছর লাগবে বন্দর হিসেবে পরিচালনা করতে। ধরলাম ২০৩০-৩১। সত্যিকার ফুল স্পিডে কাজ শুরু হবে পাঁচ বছর পর। আমাদের লোকজন এর মধ্যে অভিজ্ঞ হবে। ক্রমে তাদের ওপর ভরসা করবে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, ২০৩১ সালে তারা কর্মক্ষম হয়ে যায়, সব কিছু চালু হয়ে যায় ২০৩৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর যত দেশে যত বন্দর তারা চালায় এসব টপ কোম্পানি তাদের বহু জায়গাতে বাংলাদেশিরাই পরিচালনা করবে। তাড়াতাড়ি বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা আছে আমাদের লোকদের। দেখবে যে বন্দরে পা দাও দেখবে পরিচালনা করছে বাংলাদেশি। কোথা থেকে এসেছে? চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। চাকরি কমবে নাকি চাকরি বাড়বে। আমরা বুঝতে চাই না কেন। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটা করবে। আমাকে দরখাস্ত নিয়ে ঘুরতে হবে না। যারা ভালো কাজ করবে পরিবারসহ নিয়ে যাবে। যে জায়গা খালি হবে সেখানে আরেক বাংলাদেশি চাকরি পাবে। কাজেই বিরাট একটা সুযোগ আমাদের।

তিনি বলেন, একসময় দেখা যাবে যে বন্দরেই পা দাও পরিচালনায় সব বাংলাদেশি, চাটগাঁইয়া, নোয়াখাইল্যা, বরিশাইল্যা। সব আমাদের দেশি। আমাদের সেই ক্ষমতা আছে। অবজ্ঞা করে, পাশ কাটিয়ে চলে গেলে আমাদের কপালে দুঃখ দিলাম। সবার কাছে অনুরোধ, বন্দর চেয়ারম্যানের পাশে আমরা দাঁড়াই। আমাদের বলেন, আপনি কী করতে চান। আমরা তার দলে শরিক হলাম। এ চট্টগ্রাম বন্দর দেশসেরা বন্দর হিসেবে রাখবো এ জন্য কারণ এটি সেরা না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সেরা হবে না। এ কথাটা আমাদের বুঝতে হবে এবং তড়িৎ সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। ২০৩৬ সালের কথা বললাম, যেখানে বাংলাদেশিরাই পৃথিবীর বন্দরগুলো চালাবে। সেই দিনের আমরা অপেক্ষায় থাকলাম। আমি বিশ্বাস করি, আমরা দ্রুত চুক্তিগুলো সই করে ফেলতে পারি। কাজগুলো শুরু করতে পারি। অনেক দিন গত হয়ে গেছে। আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই আমাদের।

 

মন্তব্য করুন