তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ে ফিরলো

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: আজ বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আপিল বিভাগ বলছেন, বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।

বেঞ্চের অপর ৬ বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

রায় ঘোষণার সময় আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।

গত ১১ নভেম্বর এ বিষয়ে শুনানি শেষে ২০ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত। শুনানিতে বিএনপি, জামায়াত ও আপিলকারীদের আইনজীবীরা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলেও আগামী নির্বাচন হবে অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনে। তবে চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন তৎকালীন আপিল বিভাগ। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরাতে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়।

চলতি বছরের ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদন মঞ্জুর করেন সর্বোচ্চ আদালত। দেয়া হয় আপিলের অনুমতি। এরপর ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ জন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার আপিল করেন।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে ঐতিহাসিক ও আজকের এই দিন দেশের মানুষের জন্য ঈদের দিন বলে উল্লেখ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা।

বিএনপি’র আবেদনের পক্ষে শুনানি করা সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন আজকের রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের এই দিন সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ঈদের দিন। সর্বসম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।’

তিনি আরো বলেন, দেশের মানুষ এখন স্বাধীনভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কারণেই আজকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলো।’

বিএনপি’র আবেদনের পক্ষে শুনানি করা সিনিয়র আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করেছিল। তারপর দেশের মানুষ আর ভোটাধিকারের সুযোগ পায়নি। ১৫৪ জন্য সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল, দিনের ভোট রাতে হয়েছিল। আর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায়টি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতিফলন ছিল, যা আমরা আইন-আদালতের ভাষায় গ্রহণ করতে পারিনি।

বদিউল আলম মজুমদারসহ চার আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করা সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া রায়টিকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ত্রয়োদশ সংশোধনী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে এল। আজকের রায়টি সামগ্রিকভাবে এই সময়ের পটভূমিতে খুবই ঐতিহাসিক।

তিনি আরো বলেন, খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া রায়টি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। রায়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লেখা হয়েছিল।

আজকের রায়ের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে এই মামলায় জামায়াতের পক্ষে শুনানি করা সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, এই রায়টি বর্তমানে কার্যকর হবে না। এটা কার্যকর হবে আগামীতে। অর্থাৎ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকারিতা থাকবে না। চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে এটা কার্যকর হবে।

বহুল আলোচিত এই আপিলে বিএনপি’র পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় ১৯৯৬ সালে।

এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে করা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

ঘোষিত রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে আনা পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়। এরপর ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক ও এক ব্যক্তি আবেদন করেন। সে রিভিউ আবেদন থেকে আপিল শুনানির জন্য গত ২৭ আগস্ট লিভ মঞ্জুর করে ২১ অক্টোবর আপিল শুনানির দিন ধার্য করেন।

পরবর্তী ১০ দিন এই আপিল শুনানি শেষে রায়ের দিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত।

মন্তব্য করুন