বাংলার সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ইতিহাস

রাকিবুল ইসলাম চৌধুরী: বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে সুফি সাধকরা বাংলার মাটিতে পা রেখেছেন, কেউ এসেছেন স্থলপথে, কেউবা জলপথে। তাদের বেশিরভাগই এসেছিলেন ইয়েমেন, তুরস্ক, ইরাক, খোরাসান, আফগানিস্তান এবং আরবের দেশগুলো থেকে। বাংলার আধ্যাত্মিক জগতে সুফিদের অবদান অতুলনীয়, যা এখানকার মানুষের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

বাংলাদেশের যেসব শহরে সুফিদের গভীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তার মধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট এবং ঢাকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ তিনটি শহর সুফি সাধকদের কর্মক্ষেত্র এবং আধ্যাত্মিক প্রভাবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বাংলার মাটিতে সুফি সাধকদের আগমন এবং তাদের কর্মকাণ্ডের এক সমৃদ্ধ ও চমকপ্রদ ইতিহাস বিদ্যমান।
চট্টগ্রাম দিয়ে শুরু করা যাক।
চট্টগ্রাম ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ নামে পরিচিত। ড. এনামুল হক বাংলা ও ইংরেজি উভয় গ্রন্থে ‘বাংলায় সুফিবাদ’ নিয়ে বারো জন সুফিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন যারা বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন।১

তাঁরা হলেন-১. সুলতান বায়েজিদ বোস্তামি (ইন্তেকাল ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দ), ২. শাহ ফরিদুদ্দীন শাকরগঞ্জ (১১৭৭-১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দ), ৩. শাহ বদরুদ্দিন আল্লামা (১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে জীবিত ছিলেন), ৪. কাতাল পীর (শাহ বদরের সমসাময়িক), ৫.শাহ মহসিন আউলিয়া (ইন্তেকাল- ১৩৯৭ খ্রিষ্টাব্দ), ৬. শাহ পীর (ইন্তেকাল-১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ), ৭.শাহ উমর (আঠারো শতকের প্রথমার্ধে বসবাস করছেন), ৮. শাহ বদি (ধারণা করা হয়, তিনি চারশত বছর আগে চট্টগ্রামে এসেছিলেন), ৯. শাহ মোল্লা মিসকিন (যিনি বদর শাহের কয়েক বছর পরে চট্টগ্রামে এসেছিলেন), ১০. শাহ জায়েদ (স্থানীয় লোকজনের ধারণা এই যে তিনি প্রায় চার-পাঁচশো বছর আগে বেঁচে ছিলেন), ১১. শাহ চাঁদ আউলিয়া (তিনি প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে অর্থাৎ পঞ্চদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়), ১২. কাজী মুওয়াক্কিল (আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক (১৬৫৯-১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ)। শাহ বদর তুর্কিদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পরে আরাকানের মগরা মুঘল আমলের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে বাস করত। কথিত আছে যে শাহ বদর মগদের পরাজিত করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষায় রচিত একটি পুরানো গীতিকাব্যে শাহ বদরের নাম পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামে শীর্ষস্থানীয় আওলিয়া পীর হজরত মহসিন আউলিয়ার মাজারে রাখা একটি পাথরে খোদাই করে লিখা আছে যে, পীর শাহ বদর ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামে বসবাস করেছিলেন। সুতরাং লোকমুখে শুনার ভিত্তিতেই শুধু নয় এটা প্রমাণিত যে, শাহ বদর ছিলেন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

বঙ্গের মাঝিরা তাদের নৌকোগুলিতে পাল তোলার আগে শাহ বদরের কথা মনে করে নিচের গানটি গাইতেন-
‘আমরা আছি পোলাপাইন, গাজী আছে নিগাহবান’
ইতিহাস অনুসন্ধান করে জানা যায় পীর বদর শাহ ছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম ইসলাম প্রচারক, যিনি সেখানকার মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। তাঁর প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে অন্যান্য সুফি সাধকরাও ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত হন। এদের মধ্যে হজরত শাহ সুফি আমানত খান অন্যতম বিশিষ্ট নাম।
চট্টগ্রামে তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবদুল করিম তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর গবেষণার আলোকে জানা যায় যে, হজরত শাহ সুফি আমানত খান ছিলেন মহান সুফি সাধক হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর বংশধর। তাঁর পূর্বপুরুষরা বাগদাদ থেকে বিহারে এসে বসতি গড়েছিলেন।
প্রফেসর করিমের গবেষণা অনুসারে, শাহ আমানত খান ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময় থেকে বিহারে বসবাস করলেও, ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের কিছু পর চট্টগ্রামে আগমন করেন। ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দের আগে থেকেই তিনি চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ধারণা করা হয়, ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে এবং সম্ভবত ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দের আগে কোনো এক সময়ে তাঁর ইন্তেকাল ঘটে।

প্রফেসর আবদুল করিমের গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী এ তথ্য পাওয়া যায়। ২

সিলেটে সুফিদের আগমন নিয়ে বইয়ে একটা বিস্তারিত লেখা আছে তাই আবার পুনরাবৃত্তি করছি না। চলে যাই ঢাকার দিকে

বাংলার সুফি সাধকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় গোলাম সাকলায়েনের লেখা গ্রন্থে। ৩
ঢাকার সুফি সাধকদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত হজরত শাহ মালেক ইয়েমেনী। তিনি হজরত শাহ জালালের বারো সঙ্গীর একজন ছিলেন এবং তাঁর সমাধি বর্তমান ইডেন বিল্ডিংয়ের (সরকারি সচিবালয়ের) দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত।

আরেক প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ আলী বাগদাদি, যিনি ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে একশোজন সুফিকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে আসেন এবং সেখান থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ঢাকায় পা রাখেন (সূত্র: ইস্ট বেঙ্গল গেজেটার, ডাক্কা, ১৯১২, পৃষ্ঠা ৬৫)। ঢাকার নারিন্দায় হজরত শাহ আহসানুল্লাহ (জন্ম ১৮১৪) বসতি স্থাপন করেন, যিনি পরে বঙ্গের প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

ঢাকার হাইকোর্টের পূর্ব পাশে শায়িত আছেন হজরত শরফুদ্দীন চিশতী ওরফে খাজা চিশতী বেহেশতি (মৃত্যু: ৯৯৮ হিজরি)। গুলিস্তান ভবনের পাশে পীর গোলাপ শাহ এবং মতিঝিলে শায়িত আছেন শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুতশেকন। আজিমপুরে রয়েছেন সুফি দায়েম এবং চক বাজার মসজিদের প্রাঙ্গণে রয়েছে হজরত মওলানা হাফেজ আহমেদ জৈনপুরীর সমাধি। তিনি বিখ্যাত ধর্ম সংস্কারক মওলানা কারামত আলি জৈনপুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন এবং কুমিল্লা, নোয়াখালি, বাকেরগঞ্জ ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বিহারের মানেরির শায়খ ইয়াহইয়া (১২৬২) ছিলেন একাধারে বিদ্বান ও সুফি। অল্প বয়সেই তিনি তাঁর শিক্ষক, বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়খ শারফ-আল-দীন আবু তাওয়ামাহর সঙ্গে সোনারগাঁয়ে আসেন। সোনারগাঁ তখন ইসলামি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। শারফ-আল-দীন মানেরি পরে মানেরে ফিরে গিয়ে ১৪৯৩ সালে আধ্যাত্মিক ও মরমিবাদের উপর তাত্ত্বিক গ্রন্থ রচনা করেন।

একদিন রাত আটটার দিকে চট্টগ্রামের জামালখানে অবস্থিত বাতিঘরে গেলাম, হঠাৎ একটা বই চোখে পড়লো ‘সুলতানি আমল’ কৌতুহল বসত হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ বইয়ের ১৪৬ পৃষ্ঠা খুলতেই দেখি ইবনে বতুতার বাংলাদেশে আসার ইতিহাস। তিনি যে বাংলাদেশে এসেছেন তা অবশ্য আমি আগেও পড়েছিলাম সুফিজম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে। আগে জানতাম তিনি সরাসরি সিলেটে এসেছিলেন শাহ জালালের সাথে দেখা করতে তবে এ বই পড়ে আমার ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেলো ইবনে বতুতা মূলত প্রথমে এসেছিলেন চট্টগ্রামে তারপর গিয়েছিলেন সিলেটে। এই ‘সুলতানি আমল’ বইটা মূলত লেখা হয়েছে সুলতানদের কাহিনি নিয়ে সেখানে ইবনে বতুতার সম্পৃক্ততার ফলে তার ঘটনা চলে এসেছে।

বইটির লেখক ড. মোহাম্মদ মোহর আলী এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে, বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাকিব বিন জাকির। এ বই পড়ে ইবনে বতুতার বাংলাদেশে আগমন নিয়ে নানা তথ্য জানলাম এর কিছু সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরছি। ৪

সুলতান ফখরউদ্দীন মোবারকের শাসনামলে ইবনে বতুতা বাঙলায় সফর করেন। উত্তর আফ্রিকা, আরব এবং মুসলিম দুনিয়ায় ব্যাপক সফর করে এবং দিল্লিতে কাজি হিসেবে চাকরি করে, মরোক্কোর এ পরিব্রাজক এবার আরও দূরবর্তী মাশরিক ভূখণ্ডে, বিশেষত চীনের উদ্দেশ্যে পুনরায় তাঁর সফর শুরু করেন। ‘ফাত্তান’ নামক বন্দর থেকে তিনি জাহাজে চড়েন, কিন্তু বেশিদূর যাবার আগেই জাহাজটি সামুদ্রিক ডাকুদের আক্রমণে ডাকাতির শিকার হয়। এরা অন্য লোকদের সাথে বতুতাকেও তীরে ছেড়ে যায়। অতঃপর তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের কলকাতায় পৌছেন এবং কিছুদিন সেখানে কাটানোর পরে আরেকটি জাহাজে চড়ে এক গুচ্ছ দ্বীপের মধ্য দিয়ে সফর করেন। এই দ্বীপের নাম তিনি ‘ধৈবাত-আল-মহল’ বলেছেন।

যাহোক, চল্লিশ রাত সমুদ্রে কাটানোর পরে তিনি ‘বাঙ্গালা দেশে’ এসে পৌঁছান। তিনি লিখেছেন, ‘বাঙ্গালা দেশে এসে প্রথম যে শহরে আমরা প্রবেশ করি তার নাম সাদকাঁও। বিশাল সাগরের কিনারায় বড় এক শহর। হিন্দুদের তীর্থ স্থান গঙ্গা ও (যমুনা) নদী এর সাথে মিলিত হয়ে সাগরে পতিত হয়। নদীতে অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এগুলো দ্বারা তারা লখনৌতি দেশের সঙ্গে লড়াই করে।’

এখানে, সাদাকাঁও শহরের শনাক্তকরণ নিয়ে আগ থেকেই বিতর্ক রয়েছে। স্কলারদের অধিকাংশেরই মত, হুগলির নিকটে অবস্থিত সাতগাঁওই সাদকাঁও শহর। তারা বলেন, ঐ সময়ের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর ছিল। সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে ইবনে বতুতার বর্ণনা বলে যে, এটি ছিল চট্টগ্রাম শহর। বর্তমানেও এটি সচরাচর ‘চাটগাঁও’ নামেই পরিচিত। এক্ষেত্রে ইবনে বতুতার বর্ণনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো এ শহর ‘বিশাল সাগরের’ তীরে অবস্থিত ছিল। ‘বিশাল সাগর’ এখানে ভারতমহাসাগর কিংবা বঙ্গোপসাগরই হবে। সে মোতাবেক কোনোভাবেই এটি হুগলির নিকটে অবস্থিত কোনো জায়গা হতে পারে না। কেননা হুগলি শহর হুগলি নদী থেকে প্রায় একশো মাইল উজানে অবস্থিত। অথচ চট্টগ্রাম শহর কর্ণফুলী নদী থেকে প্রায় আশি মাইল দূরে অবস্থিত। আগে যেমন বন্দর সমুদ্র পাড়ে অবস্থিত ছিল, এখনও তেমনই আছে।

দ্বিতীয়ত, সাগরে পতিত হওয়া গঙ্গার মোহনাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম একেবারে পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। ইবনে বতুতা এখানে স্পষ্টভাবে সাগরের সাথে গঙ্গার মিলিত হবার কথা বলেছেন। যমুনা নদীর নাম উল্লেখ করেছেন। গঙ্গা ও যমুনা দুটো নদীই সাগরে পতিত হয় এর দ্বারা তিনি নদীদ্বয়ের এক সাথে বয়ে যাওয়াকে বোঝাননি, বরং তাদের সংযুক্ত ধারার মুখকে বুঝিয়েছেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যমুনা নদী উত্তর ভারতে অবস্থিত। এটি এলাহাবাদের নিকটে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়। মিলিত-স্রোতোধারা বাঙলার দিকে বয়ে যায়, এখানে প্রবেশ করে এটি ঢাকা জেলার উত্তর সীমানার কাছে আবার ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়। স্থানীয়ভাবে এটি যমুনা নামেও পরিচিত। অতঃপর এই সংযুক্ত স্রোতোধারা আবার একই ঢাকা জেলার দক্ষিণ সীমানার কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশাল এক স্রোতোধারা তৈরি করে। সাগরে পতিত হবার আগে এর মুখ বরিশাল জেলার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত এবং চট্টগ্রাম জেলা পর্যন্ত প্রসারিত হয়।

সাদাকাঁওকে হুগলির নিকটে অবস্থিত সাতগাঁও শহর হিসেবে যারা শনাক্ত করতে চান তারা এ কথাকে জোর দিয়ে বলেন যে, হুগলির কাছে ত্রিবেণীতে এটি ছিল হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ স্থান।

সাদকাঁওতে হিন্দুরা তীর্থের জন্য আসতেন, একথা বস্তুত ইবনে বতুতা বর্ণনায় বলেনইনি। এ বিষয়টিকে আরব পাঠকদের সামনে শনাক্ত করিয়ে দেওয়ার সময় তিনি গঙ্গা নদীকে এভাবে উপস্থান করেছেন যে, ‘এটিই হলো হিন্দুদের জন্য সেই পবিত্র তীর্থ স্থান’।

যাহোক, পুরাতন সাতগাঁও (হুগলি) এর সাথে অবস্থিত নদীটি চওড়া ছিল এবং ত্রিবেণী ছিল গঙ্গার অন্য দুটি ছোট শাখানদীর মিলিত স্থান। তথাপি এই জায়গাটিকে গঙ্গা ও যমুনার সংযুক্ত স্রোতোধারা হিসেবে বর্ণনা করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। ইতোপূর্বে বলেছি, সাদকাঁও শহরটি এই নদী দুটির সংযুক্ত স্রোতোধারায় অবস্থিত ইবনে বতুতা তা বোঝাতে চাননি। তিনি মূলত জোর দিয়েছেন ‘বিশাল সাগরের কিনারা’র উপর যেখানে গঙ্গা মিলিত হয়।
তৃতীয়ত, অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ইবনে বতুতা বাঙলা ও লখনৌতিকে পৃথক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি একদম স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন যে, সাদকাঁও বাঙলায় অবস্থিত একটি শহর। ইবনে বতুতার সফরের প্রায় একশত পঁচিশ বছর আগে সাতগাঁও (হুগলি) অঞ্চল মুসলিম হুকুমাতের নিয়ন্ত্রণে আসে (ঐ জায়গায় আবিষ্কৃত জাফর খানের সর্বশেষ শিলালিপির গায়ে লেখা তারিখ ৭১০ হিজরি/১৩১০ খ্রিষ্টাব্দ)।

শিলালিপি ও রেওয়ায়েত থেকে প্রাপ্ত ঐ অঞ্চলে মুসলিম হুকুমাত বিস্তৃতির ইতিহাসে কোনোভাবেই হুগলিকে নৌ ধারার নদীতীরস্থ কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে ইঙ্গিত করে না। যাহোক না কেন, এই অঞ্চলটি তখন বাঙলার অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে পরিচিত ছিল না। তাছাড়া, ইবনে বতুতার সফরকালে এই অঞ্চল খুব সম্ভবত আলী শাহের দুশমন এবং তার পালিত ভাই লখনৌতির ইলিয়াস শাহের করায়ত্তে ছিল। ইবনে বতুতা এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে পার হয়ে থাকলে তিনি এ ব্যাপারে নেহায়েত পরোক্ষভাবে হলেও কিছু না কিছু বলে যেতেন।

চতুর্থত, লখনৌতি থেকে বাঙলাকে পৃথক করার বিষয়ে ইবনে বতুতা বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন। সাদকাঁও দ্বারা যে তিনি চট্টগ্রাম বুঝিয়েছেন তা অধিক স্পষ্ট হয় কয়েকটি বিষয় থেকে। যেমন, তিনি ঐ অঞ্চলের শাসক হিসেবে ফখর উদ্দীনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন কীভাবে ফখর উদ্দীন নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং লখনৌতি শাসকের সঙ্গে তাঁর কেমন সম্পর্ক ছিল। এটি সকলেরই জানা আছে যে, ফখর উদ্দীন চট্টগ্রাম অঞ্চলকে মুসলিম হুকুমাতের অধীনে নিয়ে আসেন।
সাদকাঁও শহরের কাছে নদীর অভ্যন্তরে অসংখ্য জাহাজের উপস্থিতি এবং এগুলো দ্বারা লখনৌতির সাথে লড়াই সম্পর্কে ইবনে বতুতা যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখান থেকে বোঝা যায় যে, পূর্ব দিকে বিস্তৃতি অভিযানকালে ফখর উদ্দীন বেশ বড় একটি নৌশক্তি দাঁড় করান। পরবর্তীতে এটি তার শক্তির মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে। স্মরণ করে দেখা যেতে পারে, ইতোপূর্বে লখনৌতির গভর্নর কদর খানের আক্রমণের শিকার হয়ে ফখর উদ্দীন প্রথমে পূর্ব দিকে সরে আসেন, এবং তারপর, বর্ষা মৌসুমে নদীপথে কদর খানকে ঘেরাও করে পুনরায় সোনারগাঁও দখলে নেন। ইবনে বতুতা লিখেছেন:
‘ফখর উদদীন যখন দেখতে পান সালতানাত নাসির উদ্দীনের বংশধরদের হস্তচ্যুত হতে যাচ্ছে তখনই তিনি সাদাকাঁও থেকে বিদ্রোহ করে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন।’
অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাহরাম ইলিয়াস তাতার খানের ইন্তেকালের পর ফখর উদ্দীন পূর্ব বাঙলায় বিদ্রোহ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ইবনে বতুতা উল্লিখিত বর্ণনা এ তথ্যটিকে নিশ্চিত করে। ইবনে বতুতার বিবরণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, চট্টগ্রামের পূর্বাঞ্চলে ফখর উদ্দীনের শক্ত ঘাঁটি ছিল এবং তিনি মজবুত নৌশক্তির অধিকারী ছিলেন।

নানা পুরনো গ্রন্থ পড়ে ও গবেষণা করে যে তথ্য হাতে এসেছে সেগুলো কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে ফখর উদ্দীন বিদ্রোহ করেন দক্ষিণ-পূর্ব বাঙলা অথবা হুগলি অঞ্চল থেকে। কাজেই, যে জায়গা থেকে বিদ্রোহ করে ফখর উদ্দীন স্বাধীন হবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটি সুনিশ্চিতভাবে চট্টগ্রাম ছিল। ফখর উদ্দীন বর্ষা মৌসুমে লখনৌতি আক্রমণের জন্য জাহাজ ব্যবহার করতেন। ইবনে বতুতা এ জাহাগুলোকে সাদকাঁও শহরের কাছে অবস্থিত নদীতে দেখেন। ফখর উদ্দীনের রাজধানী ছিল সোনারগাঁ। স্পষ্টতই রাজধানীকে বিনা হেফাজতে রেখে ফখর উদ্দীনের পক্ষে হুগলির মতো দূরবর্তী জায়গায় তাঁর জাহাজগুলো রাখা সম্ভব ছিল না। বরং, তাঁর দিক থেকে এটিই যুক্তিসম্মত ছিল যে, তিনি রাজধানীর অদূরে, সোনারগাঁ থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণে, গঙ্গা নদীর মুখে জাহাজগুলোকে প্রস্তুত অবস্থায় রাখেন।

সুতরাং, একটু সতর্কদৃষ্টিতে ইবনে বতুতার বিবরণকে পাঠ করলে

পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, তিনি বাংলায় এসে চট্টগ্রাম বন্দরে অবতরণ করেন। এটি অনেক আগ থেকেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর হিসেবে বহাল ছিল। অতএব, ইতিহাস বদলে ইবনে বতুতাকে চট্টগ্রাম থেকে হুগলিতে নিয়ে যাবার কোনো জরুরত নেই।

ইবনে বতুতা বর্ণনা করেছেন যে, সাদকাঁওতে প্রবেশ করে তিনি স্বেচ্ছায় এ অঞ্চলের শাসক ফখর উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাননি। কেননা ফখর উদ্দীন ছিলেন দিল্লি সুলতানের একজন বিদ্রোহী। এভাবে ফখর উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে এটি দিল্লি সুলতানের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।

তথাপি, বতুতা উল্লেখ করেছেন যে, ফখর উদ্দীন ছিলেন একজন দিল-দারাজি সুলতান। তিনি আগন্তুক ও মেহমানদের প্রতি মেহেরবান ছিলেন। ইবনে বতুতার পর্যবেক্ষণে এসেছে যে, ঐ সময়ে বাংলায় অসংখ্য ফকির কিংবা রুহানি দরবেশ ছিলেন। বিশেষত সুলতান তাদের খাস কদর করতেন। তাদেরকে তিনি মুক্তভাবে বাংলার জমিনে সফর করে বেড়ানোর সুযোগ দেন। নদীপথে আসা-যাওয়ার সময় তাদের কাছ থেকে কোনো টোল আদায় করা হতো না। উল্টা হাতে কানাকড়ি না থাকলে তাদেরকে তার বন্দোবস্ত করে দেয়া হতো। একজন ফকির নতুন শহরে পৌঁছামাত্রই তাকে আধা-দিনার দিয়ে দেয়া হতো।

এমনকি সুলতান ফখর উদ্দীন শায়দা নামক এক ফকিরকে নায়েব নিয়োগ করেন, তারপর তিনি তার এক শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে বের হন।

শায়দা, অবশ্য, সুলতানের একমাত্র ছেলেকে খুন করে বিদ্রোহ করেন এবং সুলতান হবার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে শায়দাকে শায়েস্তা করতে সুলতান জলদি তাঁর অভিযান থেকে ফিরে আসেন। শায়দা সোনারগাঁ পালিয়ে যান। সেখানে তিনি সাধারণ জনগণের হাতে বন্দি হন এবং সুলতানের আদেশমতো তার গর্দান নিয়ে নেওয়া হয়। এই বিদ্রোহের কারণে শায়দার অনুসারী আরও অসংখ্য ফকির তাঁদের জীবন হারান। অতঃপর তাঁদের প্রতি সুলতানের মহব্বত সমাপ্ত হয়ে যায়।

ইবনে বতুতা সাদগাঁও থেকে সরাসরি আসাম অথবা ‘কামরূপ পাহাড়’ এ সফর করেন। পূর্ব দিকে তার এ সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিখ্যাত রুহানি দরবেশ ‘শায়খ জালাল উদ্দীন তাবরিযির সাথে সাক্ষাৎ করা। তার দরগাহ ছিল আসামে (সিলেট)। কোন রাস্তা ধরে ইবনে বতুতা সিলেট সফর করেন সেটি তিনি পরিষ্কার বর্ণনা করেননি। তিনি নিছক এতটুকুই বলেছেন যে, সাদকাঁও থেকে কামরূপ পাহাড়ের দূরত্ব এক মাসের সফর। এটি এক বিশাল রাস্তা, যা তিব্বত ও চীন পর্যন্ত বিস্তৃত’।

শায়খ জালাল উদ্দীন (শাহজালাল) অসাধারণ রুহানি গুণাবলি সম্পন্ন একজন ব্যক্তি ছিলেন। ইবনে বতুতার মতে, ‘তিনি ছিলেন মুসলিম বসতি স্থাপনকারীদের একজন এবং অনেক চমৎকার কাজ করতেন।’ খলিফা আল-মুতাসিম বিল্লাহ গুপ্ত হত্যার শিকার হবার সময় তিনি বাগদাদে হাজির ছিলেন। অতঃপর তিনি আসামে চলে আসেন। এখানকার লোকজন তাঁর হাতে ইসলাম কবুল করেন। এ কারণে তিনি তাদের সাথে স্থায়ীভাবে থেকে যান। তাঁর একমাত্র সম্বল ছিল কেবল একটি গরুর দুধ। এই গরু থেকে দশ দিন অন্তর দুধ পিয়ে তিনি চল্লিশ বছর যাবৎ রোজা রাখেন। নিচু এক পাহাড়ের গুহা ছিল তাঁর আস্তানা। এর কাছেই ছিল একটি বিমারিস্তান এবং একটি মসজিদ।

ইবনে বতুতা তার বেশ কিছু অলৌকিক কাজের বর্ণনা দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো, বতুতা আসাম অঞ্চলে আগমন করলে আগে থেকেই কুদরতের মাধ্যমে তার হাজিরার খবর পেয়ে শায়খ তাকে স্বাগত জানাতে চারজন লোককে প্রেরণ করেন। এই লোকেরা শায়খের আস্তানা থেকে চারদিন সফরের দূরত্বে এক জায়গায় ইবনে বতুতাকে খুঁজে পান। এরা তাকে জানান যে, তারা শায়খের আদেশমতো তাঁকে নিতে এসেছেন। তাদের সঙ্গে ইবনে বতুতা যখন শায়খের নিকট হাজির হলেন, তখন শায়খ দাঁড়িয়ে তার সাথে কোলাকুলি করেন, তাঁর দেশ ও সফর সম্পর্কে জানতে চান। অতঃপর তিনি তাঁর লোকদেরকে আদেশ করেন যাতে তারা তার যথাযথ খাতির ও আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করে। সে মোতাবেক তারা বতুতাকে খানকায় নিয়ে যান এবং তিনি তিন দিনের জন্য সেখানে মেহমান হিসেবে থাকেন।

ইবনে বতুতা আরও উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই শায়খের কাছে আসা-যাওয়া করতেন এবং উপহার নিয়ে আসতেন।
এগুলো অবশ্য ফকিরদের খানাপিনা এবং মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যবহার করা হতো। সিলেটের জনসাধারণদের দেখে মরোক্কার এ পরিব্রাজক বিমোহিত হয়ে পড়েন। তাঁর মতে, এরা তুর্কিদের মতো শক্তিশালী খেদমতগার। এদের একজন জওয়ান অন্য জায়গার কয়েকজন জওয়ানের সমান।’
শায়খের কাছ থেকে বিদায় নেবার পর ইবনে বতুতা তাঁর ফিরতি সফর শুরু করেন।

চলুন পরিশেষে শাহজালাল (র:হ) সম্পর্কে আরো কিছু জেনে আসি। ৫
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর নাম শোনেননি এমন মানুষ খুবই কম। তবে তাঁকে নিয়ে আমরা কয়জনই বা বিস্তারিত জানি? হয়তো জানি, সিলেটে তাঁর একটি মাজার রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন মানুষ ঘুরতে যায়। জানি তিনি এক দূর দেশ থেকে এসেছিলেন। এর বাইরে আর কতটুকুই বা জানা আমাদের! আসলে এ উপমহাদেশে ইসলামের বিকাশে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি শুধু একজন ধর্মপ্রচারকই নন, বরং তাঁর মাধ্যমে একটি নতুন সভ্যতার সূচনা হয়েছিল সিলেটে।
বাংলাদেশের সুফিবাদের ইতিহাসে হজরত শাহজালাল (রহ.) একটি অনন্য নাম, যাঁর আগমনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে আধ্যাত্মিকতার এক নবজাগরণের সূচনা হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে (অন্য মতে, ১৩০১ খ্রিষ্টাব্দে) ইয়েমেন থেকে একটি দল নিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করেন তিনি, যেখানে তখনও ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। শাহজালাল (রহ.) তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং আচার-আচরণের মাধ্যমে কুসংস্কার, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে নতুন একটি জাগরণের সুর বেঁধে দেন। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে সিলেটে আধ্যাত্মিকতা এবং মানবতার বাণী প্রচারিত হয়, যা বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শাহজালালের আগমনের কারণ ও উদ্দেশ্য

শাহজালাল (রহ.)-এর মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে শান্তি, সহমর্মিতা এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনযাপন, সাধনা এবং ধর্মীয় আদর্শে মানুষ এমন এক পথের সন্ধান পায়, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তাদের আত্মাকে শুদ্ধ করার দিকে প্রেরিত করে। তাঁর আগমনকে এ অঞ্চলে আধ্যাত্মিকতার প্রচার এবং নৈতিকতার উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শাহজালালের জীবনী নিয়ে প্রচলিত কিছু মিথ ও গল্প

শাহজালালের জীবনী নিয়ে প্রচলিত কিছু মিথ ও গল্প এ অঞ্চলের জনগণের মাঝে তাঁকে আরও বেশি অলৌকিক এবং আধ্যাত্মিক এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। একটি প্রচলিত গল্পে বলা হয়, শাহজালালের জন্মের সময় তাঁর মা স্বপ্নে দেখতে পান যে, তাঁর সন্তান একদিন দূর দেশে গিয়ে মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবে। এই স্বপ্নের কারণে তাঁর মা তাঁকে আধ্যাত্মিক জীবনধারার পথে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। অন্য একটি গল্পে বলা হয় যে, সিলেট আসার আগে শাহজালাল এক গভীর ধ্যানে দেখেন যে এই অঞ্চলের মানুষ অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং তাদের মুক্তির জন্য তাঁকে সেখানে যেতে হবে। এই স্বপ্নের নির্দেশে তিনি দূর দেশ পাড়ি দিয়ে সিলেটে আসেন এবং মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার আলো জ্বালান। এ ধরনের গল্পগুলো মানুষের মধ্যে তাঁকে নিয়ে এক গভীর বিশ্বাস ও আস্থার সৃষ্টি করে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় জনগণের মাঝে বেঁচে আছে।

আরেকটি গল্প অনুযায়ী, সিলেটে এসে শাহজালাল (রহ.) একটি পর্বতের চূড়ায় ধ্যানমগ্ন হন এবং সেখান থেকেই তিনি তাঁর মুরিদদের সহায়তায় আধ্যাত্মিক শক্তির প্রসার ঘটান। এই ধ্যানমগ্ন জীবনের কারণে তিনি স্থানীয় জনগণের কাছে আশ্চর্য এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ইবনে বতুতার সাক্ষাৎ এবং শাহজালালের খ্যাতি

শাহজালালের খ্যাতি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, খ্যাতনামা পরিব্রাজক ও দার্শনিক ইবনে বতুতা তাঁর কথা শুনে আকৃষ্ট হন। ভারতবর্ষে ভ্রমণের সময় তিনি সিলেটে এসে শাহজালালের সান্নিধ্যে কিছুদিন কাটান। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন, শাহজালাল ছিলেন এক আধ্যাত্মিক শক্তিতে ভরপুর এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। যাওয়ার সময় শাহজালাল ইবনে বতুতাকে কিছু মূল্যবান নসিহা দেন, যা ইবনে বতুতা আমৃত্যু পালন করে যান এবং এগুলো তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
শাহজালালের ঐতিহাসিক অবদান

শাহজালাল (রহ.) তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে সমাজ সংস্কারের পথে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি শুধু একজন আধ্যাত্মিক প্রচারকই নন, বরং সমাজ সংস্কারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচারিত শান্তি ও সহমর্মিতার বাণী মানুষের মাঝে একতা ও ভ্রাতৃত্বের সেতু গড়ে তোলে। তাঁর বাণী, জীবনাচার এবং ত্যাগের আদর্শ বাংলার মানুষের মনে এক আধ্যাত্মিক প্রেরণার সৃষ্টি করে, যা আজও বহু মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।
তথ্যসুত্র:

১.এই তথ্য আমি সংগ্রহ করেছি প্রফেসর ড. এম. শমশের আলীর লেখা (বিজ্ঞান সুফি দর্শন ও রুমী) বই থেকে। ভাষান্তরঃ মাসুক আহমেদ, প্রকাশক: ঐতিহ্য, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৫১ পৃষ্ঠা, ২য় প্যারা। মূল রেফারেন্স: হক, মুহাম্মদ এনামুল, এ হিস্টোরি অব সুফিজম ইন বেঙ্গল, ডেক্কা, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৭৫।

২.করিম, আব্দুল, হজরত শাহ সুফি আমানত খান রহমতুলাহি আলাইহি, ২য় সংস্করণ, ১৯৮০, শাহজাদা বেলায়েত উল্লাহ খান কর্তৃক প্রকাশিত, দরগাহ শরিফ, শাহ আমানত লেন, চট্টগ্রাম।
৩. সাকলায়েন, গোলাম, পূর্ব পাকিস্তানের সুফি সাধক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৬১, বাংলাদেশ (পরবর্তীতে বাংলাদেশের সুফি সাধক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, ১৯৮২)।
৪. ‘সুলতানি আমল’ বই থেকে। মূল লেখক ড. মোহাম্মদ মোহর আলী, ভাষান্তর: সাকিব বিন জাকির, পৃষ্ঠা: ১৪৬-১৫২।
‘সুলতানি আমল’ বইতে যে মূল রেফারেন্সগুলো উল্লেখ আছে তা হলো:
1.Imperial Gazetteer of India, খণ্ড ১৬ (আটলাস), প্লেইট ৩০
2.ইবনে বতুতা, পৃষ্ঠা ৬১১। মূল পাঠটি নিম্নরূপ: قلما رأي فخر الدين أن مللك قد خرج عن أولاد السلطان ناصر الدين وهو مولي لهم خالف بسد كاوان بلاد بنجالة واستقل با مللك এখানে ‘সাদকাওন এবং বাঙলা’ একটি সংযুক্ত অভিব্যক্তি, এর দ্বারা একই দেশকে বোঝানো হচ্ছে। এর আগে ইবনে বতুতা উল্লেখ করেছেন যে, সাদকাওন ছিল বাঙলার একটি শহর।
3.প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১১-৬১৩।
4.প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৫।
5.যেহেতু শায়খ শাহজালালের কবর সিলেটে অবস্থিত, সেহেতু ইবনে বতুতা কার্যত সিলেট পর্যন্ত দূরত্ব ভ্রমণ করেছেন। অবশ্য, এখানে তার নামের ব্যাপারে সামান্য ধাঁধা আছে। সিলেটের শেখ ছিলেন শাহ জালাল মুজাররাদ ইয়ামানি। শেখ জালাল উদ্দীন তাবরিজি ছিলেন ভিন্ন একজন ব্যক্তি। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল উত্তরবঙ্গে (গৌড়) এবং তিনি খুব সম্ভবত ৬৪২ হি./১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
6.প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৫। ইবনে বতুতার উল্লিখিত শব্দ থেকে কিছু লেখক প্রত্যক্ষ করেন যে, ফখর উদ্দীনের অধীনে হিন্দু জনসংখ্যার আধিক্য ‘ঈর্ষা-উদ্রেককারী ছিল না’ (History of Bengal, ২য় খণ্ড, ১০২)। কিন্তু উল্লেখ্য যে, ইবনে বতুতা এখানে সিলেটের নিকটে কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার কথা বলেছেন। এই এলাকাটি মুসলমানরা সম্প্রতি অর্জন করেছিল। এমন কোনো দলিল নেই যেখান থেকে দেখা যায় যে, ফখর উদ্দীনের অধীনে সারা বাঙলায় প্রচুর সংখ্যক হিন্দু ছিলেন।

7.ইবনে বতুতা, ইতোপূর্বে উল্লিখিত, পৃষ্ঠা ৬১৫। ঘটনাক্রমে এখানে উল্লেখ্য যে, বিখ্যাত আরব জিওগ্রাফার আল-ইদ্রিসি সামান্দর বন্দরের ব্যাপারে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, এটি কামরূপ থেকে ১৫ দিনের দূরত্বে অবস্থিত। ইবনে বতুতা প্রদত্ত তথ্যসহ এটি নির্দেশ করে যে, ‘সামান্দর’ সোনারগাঁও থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থিত ছিল না। মূল:- وسافرنا في هذا النهر خمسة عشر يوما بين القري والبساتين فكانما 1 في سواق وفيه : من المراكب ما لا مبصي كثرة وفي كل مركب منها طبل فإذا التقي المركبان ضرب كل واحد طبلة وسلم بعضه على بعض

বি:দ্র: লেখাটি {সুফিতত্ত্ব ও আত্ম উন্মোচন }বই থেকে সংকলন করা হয়েছে।

লেখক পরিচিত: লেখক, সুফি গবেষক
তিনি একাধারে একজন কবি, লেখক, গবেষক, গীতিকার, সুরকার, সমাজকর্মী, সংগঠক ও সাংবাদিক।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর লেখালেখি ও গবেষণাধর্মী কাজের প্রতি আগ্রহ। নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় শিশুকিশোর দ্বীন দুনিয়ায়। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত লিখে আসছেন।
তিনি রাজনীতি, ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা , দর্শন, সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার উপর লেখালেখি করেন।
তিনি মূলত সুফি গবেষক হিসেবে বেশি পরিচিত, সুফিজমের উপর তার লেখা প্রথম গবেষণা গ্রন্থ (সুফিতত্ত্ব ও আত্ম উন্মোচন) প্রকাশীত হয় ২০২৫ সালে।
তিনি ২০২০ সালে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে লেখালেখি ও সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে যুক্ত হন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়। বর্তমানে তিনি জাতীয়, আঞ্চলিক ও কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত।
তিনি সেচ্ছাসেবী সংগঠন Unity Spark – US এর সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা। এ সংগঠন প্রধানত সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইউনিটি স্পার্ক বর্তমানে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর-এর আর্মি উইংয়ে যুক্ত ছিলেন। তিনি কর্ণফুলী রেজিমেন্টের একজন চৌকশ সদস্য ছিলেন, তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যাডেট জীবনে সর্ব বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তিনি অর্জন করেছেন ‘বেস্ট ক্যাডেট অ্যাওয়ার্ড’।
তাঁর লেখা বেশ কিছু গানের মধ্যে কয়েকটি গান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের থিম সং হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো Bangladesh Youth Cadet Forum-এর থিম সং, যা তাঁর লেখা ও সুর করা।
প্রকৃতিপ্রেমিক ও ভ্রমণপিপাসু রাকিবুল ইসলাম চৌধুরী প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে ভালোবাসেন। সৌন্দর্য, রহস্য এবং সত্যের সন্ধানে ছুটে চলাই তাঁর নেশা। প্রান্তর থেকে পাহাড়, জনপদ থেকে নদী-সবখানেই ছড়িয়ে আছে তাঁর পদচিহ্ন। তিনি একজন পরিব্রাজক, যাঁর জীবনজুড়ে মিশে আছে অজানার সন্ধান এবং মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।
তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভা তাঁকে এনে দিয়েছে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। লেখালেখি থেকে সংগীত, সমাজসেবা থেকে সাংবাদিকতা-সব ক্ষেত্রেই তিনি অনন্য।

মন্তব্য করুন