
ড. এম. এন. আলম: গত ৩ আগষ্ট সরকার ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ঔষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৯৯৪ সালের প্রজ্ঞাপনে শুধুমাত্র ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ঔষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল। ফলে এন্টিবায়োটিক সহ হাজার হাজার ব্রান্ডের ওষুধের মূল্য নির্ধারনের ক্ষমতা বেসরকারি ওষুধ কোম্পানীদের হাতে চলে যাবে এবং ওষুধের বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন।
দেশের গরীব জনসাধারণকে বহুজাতিক কোম্পানীর অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি এবং দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ২৮ এপ্রিল ওষুধ নীতি প্রনয়ণ করতে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী উক্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। দেশমাতৃকার টানে লন্ডনে এফ আর সি এস ফাইনাল পার্ট পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশে ফিরে আসা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বহুজাতিক কোম্পানী গুলোর ব্যবসায়িক কারসাজি ধরে ফেলেন। জীবন রক্ষাকারী এন্টিবায়োটিকের বদলে ভিটামিন, অ্যান্টাসিড, টনিক, গ্রাইপ ওয়াটার সহ নানান অপ্রায়োজনীয় ওষুধে বাজার সয়লাব করে দেশের মানুষকে শোষণ করার বিষয়টি তিনি জনসম্মুখে নিয়ে এসেছিলেন।
দেশপ্রেমিক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ফার্মা জায়ান্ট প্রভাবশালী কোম্পানীগুলোর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১,৭৪২টি ওষুধকে অপ্রয়োজনীয়/অকার্যকর ঘোষণা করতে এবং সরকার কর্তৃক সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করেন। তৎপ্রেক্ষিতে ১৯৮২ সালের ১২ জুন যুগান্তকারী ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি জারি করার পর ওষুধ শিল্পের নবযাত্রা শুরু হয়।
বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর নিষিদ্ধ, অপ্রয়োজনীয় এবং চড়া দামের ওষুধের পরিবর্তে দেশীয় কোম্পানীর ওষুধকে দ্রত রেজিস্ট্রেশন প্রদান, কাঁচামাল আমদানিসহ ন্যায্যমূল্যে বাজারজাত করার সুযোগ করে দেয় ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর। সস্তা শ্রমবাজার কেমিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও দক্ষ জনবলের সহযোগিতায় থর থর করে বিকশিত হতে থাকে ওষুধশিল্প। সৃষ্টি হয় আজকের স্কয়ার, বেক্সিমকো, একমি এবং ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। একপর্যায়ে দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে দেশীয় ওষুধের সুনাম। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানীগুলোর ক্রমাগত উত্থানে কয়েক দশকের মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানীগুলো দেশীয় কোম্পানীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ফাইসন্স, ফাইজার, হোয়েষ্কট, স্কুইব, আইসিআই, অরগানন এর মতো গ্লোবাল ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানীগুলো বাংলাদেশ থেকে তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে দেশে ৩১০টি অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানী প্রায় ৪ হাজার ৮ শত ৮০টি জেনেরিকে ৪৫ হাজার ২৯০টি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে থাকে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, নানা হুমকি-ধমকি, ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে তৎকালীন সরকার ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করার ফলে ৯০-এর দশকে ওষুধশিল্পে বিপ্লবের সূচনা হয়। একটি আমদানি নির্ভর দেশ থেকে রপ্তানিমুখী গুরুত্বপূর্ণ খাতে ওষুধশিল্প রুপান্তরিত হয়। যার সুফল দেশের জনগণ ভোগ করছে। ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করলেও অধিকাংশ কোম্পানী ওষুধের মূল কাঁচামাল (র-মেটারিয়াল) ভারত বা চীন থেকে আমদানি করে থাকে। ফলে ওষুধের মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধিসহ মানসম্মত উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
ওষুধশিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার ২০০৭ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ার বাউশিয়ায় ২০০ একর জমিতে ২৭ কোম্পানীকে ৪২টি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডেন্টস (এপিআই) প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও মাত্র চারটি কোম্পানী কাঁচামাল উৎপাদন শুরু করে। তাছাড়া ২০৩০ সালের ট্রিপসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোম্পানীগুলোর দক্ষ জনবল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের সক্ষমতাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনি শুরু করতে হবে।
ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানীগুলো বহুজাতিক কোম্পানীদের মতো লাগামহীন মূল্য নির্ধারণ করে মানুষের পকেট কাটার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেস্ব কাঁচামাল ও ওষুধ উৎপাদন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ডাক্তারদের গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিদেশ ভ্রমণের মতো অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকলে ওষুধের মূল্য বিদ্যমান মূল্যের চেয়ে ৫০% কমে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অতএব, কোম্পানীগুলোকে বহুজাতিক কোম্পানীদের মতো আচারণ না করে দেশের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে গোষ্ঠী স্বার্থের পরিবর্তে গরীব জনসাধাণের স্বার্থ বিবেচনা করে তাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার চিকিৎসা ও ওষুধ প্রাপ্তি সহজ লভ্য করতে হবে।
ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কোম্পানী, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উন্নত বিশে^র আদলে প্রাইজ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ এর মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত ৩০ ধারা সংশোধন অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। একক ভাবে কোম্পানীর পরিবর্তে প্রাইজ কমিশনের মাধ্যমে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হলে জনস্বার্থ সুরক্ষিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকারকে যেমন শিল্প বান্ধব হতে হবে তেমনি ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী সেক্টরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরো সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।
অতএব, ১৯৮২ সালের মতো সব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রদত্ত সুপারিশগুলো সংযোজন করে আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে দেশের জনগণ প্রত্যাশা করে।
লেখক: সাবেক উপ-পরিচালক ও আইন কর্মকর্তা, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ঢাকা।









