
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন স্যারের সদয় দৃষ্টি ও দিকনির্দেশনার প্রত্যাশায়
ভূমিকা: পবিত্র কোরআন—আল্লাহতায়ালার অহিভাষণ—মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা, কল্যাণ ও মুক্তির অমিয়স্রোত। এই মহাগ্রন্থকে শৈশব-কৈশোরেই হৃদয়ে ধারণ করে যে ব্যক্তি হাফেজে কোরআন হন, তিনি কেবল একজন বিদ্বান নন—তিনি হয়ে ওঠেন এক ইলাহী অঙ্গীকারের ধারক, আত্মার নূরধারক, এবং সমাজে নৈতিকতার জ্যোতিস্বরূপ!
বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ লাখেরও বেশি কোরআনে হাফেজ রয়েছেন—যাঁরা নিরবিচারে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে পবিত্র কালামের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদাকে উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই গর্বিত সাধকদের জন্য এখনো বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং সম্মানজনক অবস্থান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হাফেজদের অবস্থান: কিছু অনন্য উদাহরণ
১. সৌদি আরব
সৌদি আরবে হাফেজদের মর্যাদা প্রায় রাষ্ট্রীয় গার্ডিয়ানশিপের মতো।
সরকারি চাকরিতে হাফেজদের জন্য রয়েছে আলাদা কোটা।
“মাকতাবাতুল হিফজ” নামক পৃথক পুনর্মূল্যায়ন কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে সফল পরীক্ষার্থীরা ইমাম, মুয়াজ্জিন, শিক্ষক এবং ইসলামিক প্রশাসনিক দায়িত্বে নিযুক্ত হন।
হাফেজদের জন্য রয়েছে মাসিক ভাতা, বাসস্থান সুবিধা, হজ ও উমরায় অগ্রাধিকার এবং পেনশন সুবিধা।
এছাড়া, যাঁরা ক্বেরাতে দক্ষ, তাঁদের জন্য টেলিভিশন ও রেডিওতে কোরআন তিলাওয়াত করার বিশেষ আয়োজন থাকে।
২. কুয়েত
কুয়েত সরকার হাফেজদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত “Quran Learning Complex” পরিচালনা করে যেখানে কেবল হাফেজগণই নিয়োগ পান।
ইমামতিতে প্রবেশের পূর্বে তাঁদের ইসলামী ও সামাজিক নেতৃত্বের বিষয়ে আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এছাড়া হাফেজদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারভিত্তিক আবাসন ও পেনশন সুবিধা নির্ধারিত থাকে।
৩. মিশর
আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে হাফেজদের উচ্চতর শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়।
প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ের কোরআন হিফজ প্রতিযোগিতা আয়োজন করে যেখানে বিজয়ীদের রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
সরকারি প্রশাসনিক ও ধর্মীয় দপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে হাফেজদের জন্য বিশেষ অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
২০২৩ সালে মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে—যেসব শিক্ষার্থী পবিত্র কোরআনের পূর্ণ হাফেজ, তাঁরা “Honor Roll” প্রোগ্রামে বিশেষ সুযোগ পাবেন।
৪. মালয়েশিয়া
“Maahad Tahfiz al-Quran” নামে সারা দেশে শতাধিক রাষ্ট্রীয় হাফেজ স্কুল পরিচালিত হয়।
হাফেজদের জন্য “Tahfiz Incentive Scheme” চালু আছে, যার মাধ্যমে সরকার মাসিক আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ও স্কলারশিপে হাফেজদের বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হয়।
কিছু মন্ত্রণালয়ে হাফেজ হওয়াটা অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়।
৫. ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া হাফেজদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারিভাবে হিফজ সনদকে মাধ্যমিক সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ও জাতীয় প্রশাসনে “Tahfiz Alumni Track” চালু হয়েছে।
হাফেজদের জন্য “Pesantren Tahfiz” নামে বিশেষ স্কুল পরিচালিত হয়, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয় ঘটে।
৬. মরক্কো ও তিউনিশিয়া
হাফেজগণকে সরকারিভাবে ‘সামাজিক নৈতিকতার রক্ষক’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
তাঁদের নেতৃত্বে শিশু ও কিশোরদের জন্য কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা সরকার দ্বারা অনুমোদিত।
কোরআন তিলাওয়াতের বার্ষিক প্রতিযোগিতাগুলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় এবং পুরস্কারস্বরূপ দেওয়া হয় গাড়ি, আবাসন ও উচ্চতর শিক্ষা বৃত্তি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বিস্ময়কর সংখ্যা, অনুন্নত অবস্থান
বাংলাদেশে হাফেজ তৈরির হার বিশ্বে অন্যতম উচ্চতম। তবুও দেখা যায়—
নেই নির্দিষ্ট সরকারি নীতি বা কোটা।
নেই মাসিক সম্মানী বা পেনশন সুবিধা।
উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ ও চাকরির সুযোগ সীমিত।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রায় অনুপস্থিত।
অথচ রাষ্ট্রে বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত কোটা চালু রয়েছে—যেমন মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নারী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও অনগ্রসর অঞ্চলভিত্তিক কোটা। এসব কোটা ন্যায়সংগত এবং প্রয়োজনীয় হলেও, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সম্মানিত কোরআনের হাফেজদের জন্য এখনো কোনো পৃথক ‘হাফেজ কোটা’ রাষ্ট্রীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ একজন হাফেজ, যিনি শৈশবেই কোরআনের পূর্ণ শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করেছেন, তাঁর আত্মিক পরিশ্রম, সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের বিস্তার এবং ঈমানি চরিত্রগঠনের অবদান অনন্য ও অতুলনীয়!
রাষ্ট্রের করণীয়: বাংলাদেশে একটি মর্যাদাপূর্ণ হাফেজভিত্তিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠন
১.সরকারি চাকরিতে ‘হাফেজ কোটা’ চালু যেহেতু কোরআনে হাফেজগণ জাতির নৈতিক নেতৃত্বের ধারক, তাই তাঁদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক কোটা অবশ্যই থাকা উচিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ধর্ম মন্ত্রণালয়, হজ অফিস, মসজিদ পরিচালনা কমিটি, মাদ্রাসা শিক্ষকতা, ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদে হাফেজদের জন্য বিশেষ নিয়োগনীতি জরুরি। এই কোটার গুরুত্ব মুক্তিযোদ্ধা কোটার সমতুল্য, বরং আত্মিক অবদানের দিক থেকে আরও গভীর ও স্থায়ী।
২. উচ্চশিক্ষায় সহজতর প্রবেশ ও বৃত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাফেজদের বিশেষ স্কলারশিপ এবং সরাসরি ভর্তির সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৩. ‘জাতীয় হাফেজ দিবস’ ঘোষণা ও সম্মাননা রাষ্ট্রপতির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি বছর হাফেজদের সম্মাননা প্রদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
৪. আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বে সরকারিভাবে সহায়তা হাফেজদের ক্বেরাত ও হিফজ প্রতিযোগিতায় পাঠাতে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ফান্ড ও টেকনিক্যাল সহায়তা চালু করা অত্যাবশ্যক।
উপসংহার: হাফেজ—শুধু ধারক নন, জাতির নৈতিক দিশারী
একজন হাফেজ কেবল কোরআনের আয়াত মুখস্থকারী নন—তিনি আলোকিত সমাজ গঠনের বীজ রোপণকারী, জাতির আত্মিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের অগ্রপথিক। যদি বাংলাদেশ সত্যিই একটি ইসলামি মূল্যবোধসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের দেখতে চায়, তবে হাফেজদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সুযোগ সৃষ্টি করা হবে এক ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব!
আমরা গভীরভাবে আশাবাদী—মাননীয় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন স্যারের প্রজ্ঞাপূর্ণ দিকনির্দেশনায় এমন একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হবে, যা কোরআনে হাফেজদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে এবং বাংলাদেশকে একটি আলোকোজ্জ্বল ইসলামি মূল্যবোধসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করবে।
মুহাম্মদ টিপু সুলতান
লেখক: প্রাবন্ধিক
Mobile: 01628749427









