ঘোষণার পরও পাঁচ ব্যাংকে টাকা পাচ্ছেন না আমানতকারীরা, তোপের মুখে ব্যাংক কর্তারা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসিসহ পাঁচটি ব্যাংকে আমানত উত্তোলনে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের টাকা তুলতে গেলে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।

একই সঙ্গে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় যেসব গ্রাহকের হিসাবে লাখ লাখ টাকা জমা রয়েছে, তারা পাঁচ হাজার টাকার মতো সামান্য অঙ্কের চেক জমা দিলেও তা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে এফডিআর, ডিপিএস ও এমআইএসের জমাকৃত অর্থও তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা। এমটিএম ও এটিএম কার্ড কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মুনাফা তো দূরের কথা, মূল আমানতই তুলতে পারছেন না তারা। এতে আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতেও একই ধরনের নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন।

গ্রাহকদের অভিযোগ, ডিসেম্বর মাসে যাদের ডিপিএস বা ফিক্সড ডিপোজিটের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে, তাদের নির্ধারিত অর্থও অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে না। প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক মুনাফা স্কিমের অর্থ হোল্ড হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

শাখা পরিবর্তনে চরম ভোগান্তি

গ্রাহকদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এক শাখা থেকে অন্য শাখায় টাকা তোলা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে অ্যাকাউন্ট থাকা কোনো গ্রাহক ঢাকায় অবস্থান করলে সামান্য টাকা তুলতেও তাকে আবার চট্টগ্রামে যেতে হচ্ছে। এতে সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ বাড়ছে।

এই সংকট শুধু ডিপোজিট অ্যাকাউন্টেই সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট, বেতন অ্যাকাউন্ট, এনআরবি বা প্রবাসী অ্যাকাউন্ট, যৌথ অ্যাকাউন্ট, মানি মার্কেট অ্যাকাউন্ট এবং এটিএম কার্ড ব্যবস্থাও প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে সীমিত আকারে উত্তোলনের সুযোগ মিলছে। কিন্তু এর পর যেসব হিসাবে প্রফিট বা ডিপোজিট এসেছে, সেগুলোর টাকা তোলা যাচ্ছে না।

নিউজিল্যান্ড থেকে আসা এহসানুল করিম বলেন, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে তার প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা পাঁচ বছর ধরে জমা রয়েছে। দেশে ফিরে তিনি এক হাজার টাকাও তুলতে পারেননি। বাধ্য হয়ে খালি হাতেই ফিরে যেতে হয়েছে।

কানাডা প্রবাসী মনময়ী হাসান জানান, বাবার চিকিৎসার খরচ চালানোর জন্য মাসিক মুনাফা স্কিমে রাখা ১২ লাখ টাকার মুনাফা তিনি তুলতে পারছেন না। অথচ এই টাকাতেই তার বাবার ওষুধের খরচ চলে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপিকা বলেন, তার ডিপিএস ম্যাচিওর হয়েছে, কিন্তু টাকা তুলতে পারছেন না। ছেলের টিউশন ফি দিতে গিয়ে তাকে ধার করতে হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের ঝাড়ুদার বেবী চৌধুরি তার ১২ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রেখেছিলেন। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে ভারতে চিকিৎসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ও তার পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

শাহীনুর করিম জানান, স্বামীর অবসর-পরবর্তী সঞ্চয় ব্যাংকের পরামর্শে ফিক্সড ডিপোজিট ও মাসিক মুনাফা স্কিমে রেখেছিলেন। দেড় বছর ধরে তিনি মুনাফার টাকা তুলতে পারছেন না। আগে আত্মীয়ের মাধ্যমে টাকা তোলার সুযোগ থাকলেও নতুন নিয়মে সেটিও বন্ধ।

বিদেশে থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ব্যাংকগুলো সরাসরি গ্রাহকের উপস্থিতি ও ভোটার আইডি কার্ড ছাড়া কাউকে টাকা দিচ্ছে না। ফলে অনেক প্রবাসী ও বৃদ্ধ গ্রাহকের পেনশন বা জরুরি অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ ডিসেম্বর দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়, সাধারণ গ্রাহকদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো সময় তা উত্তোলন করা যাবে। দুই লাখ টাকার বেশি আমানতকারীদের ক্ষেত্রে কিস্তিতে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার ম্যানেজার এহসান হক বলেন, ‘গত ৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছে, শুধু সেই টাকাই দেওয়া হচ্ছে।’

মাসিক মুনাফা স্কিমের টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা বা আদেশ আসেনি। সঞ্চয়ী হিসাব, ফিক্সড ডিপোজিটসহ অন্যান্য ক্যাটাগরির জমাকৃত টাকাও বর্তমানে দেওয়া যাচ্ছে না।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তা যা বলছেন

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, ‘এই বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেখছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের করার তেমন কিছু নেই।’

মন্তব্য করুন